হিংসা, হিংসা সম্পর্কে কোরআন হাদিস


ভুমিকা৷
হিংসা কী?
হিংসা করার কারণসমূহ৷
হিংসা সম্পর্কে কোরান হাদীস৷
হিংসার হুকুম৷
হিংসুকের আলামত৷
শিক্ষণীয় ঘটনা৷
হিংসার পরিনাম৷
হিংসার প্রতিকার৷
উপসংহার৷

ভুমিকা:
মানব ইতিহাসের শুরুর দিককার কথা। পৃথিবীতে মানব পরিবার বলতে তখনো কেবলই হযরত আদম আলাইহিস সালামের পরিবার। হযরত হাওয়া রা.-এর সঙ্গে তাঁর সংসার। তাঁদের সন্তান জন্ম নিত জোড়ায় জোড়ায় এক ছেলে এক মেয়ে। তাদের জন্যে আল্লাহ তাআলার পক্ষ থেকে বিশেষ নিয়ম ছিল এমন জমজ ভাইবোন পরস্পর বিয়ে করতে পারবে না। যাদের জন্ম আগে-পরে, তারা একে অন্যকে বিয়ে করতে পারবে। হযরত আদম আলাইহিস সালামের দুই ছেলের নাম ছিল হাবীল ও কাবীল। কাবীলের সঙ্গে যে বোনের জন্ম হয় সে ছিল অধিক সুশ্রী। তাই নিয়ম ভেঙ্গে কাবীল তাকেই বিয়ে করতে চায়। আর নিয়ম টিকিয়ে তাকে বিয়ে করতে আগ্রহী ছিল হাবীলও। দ্বন্দ্ব নিরসনে তাদেরকে কুরবানী করতে বলা হল। যার কুরবানী কবুল হবে সে-ই তার উক্ত বোনকে বিয়ে করতে পারবে। এর পরের কাহিনী পবিত্র কুরআনের ভাষায়৷

اِذْ قَرَّبَا قُرْبَانًا فَتُقُبِّلَ مِنْ اَحَدِهِمَا وَ لَمْ یُتَقَبَّلْ مِنَ الْاٰخَرِ قَالَ لَاَقْتُلَنَّكَ قَالَ اِنَّمَا یَتَقَبَّلُ اللهُ مِنَ الْمُتَّقِیْنَ لَىِٕنْۢ بَسَطْتَّ اِلَیَّ یَدَكَ لِتَقْتُلَنِیْ مَاۤ اَنَا بِبَاسِطٍ یَّدِیَ اِلَیْكَ لِاَقْتُلَكَ اِنِّیْۤ اَخَافُ اللهَ رَبَّ الْعٰلَمِیْنَ…

যখন তারা উভয়ে কুরবানী করেছিল, কিন্তু তাদের একজনের পক্ষ থেকে তা কবুল করা হল এবং অপরজনের পক্ষ থেকে কবুল করা হয়নি। সে বলল, আমি অবশ্যই তোমাকে হত্যা করব। অপরজন বলল, আল্লাহ তো মুত্তাকীদের থেকেই কবুল করে থাকেন। তুমি যদি আমাকে হত্যা করার জন্যে আমার দিকে তোমার হাত বাড়িয়ে দাও, তবুও আমি তোমাকে হত্যা করার উদ্দেশ্যে তোমার দিকে আমার হাত বাড়াব না। আমি অবশ্যই বিশ্বজগতের প্রভু আল্লাহকে ভয় করি। অবশ্যই আমি চাই, তুমি আমার পাপ এবং তোমার পাপ বহন কর, এরপর তুমি দোজখিদের অন্তর্ভুক্ত হয়ে যাও। আর এটাই জালেমদের শাস্তি। অবশেষে তার মন তাকে ভাই-হত্যার বিষয়ে প্ররোচিত করল, এরপর সে তাকে হত্যা করল। ফলে সে ক্ষতিগ্রস্তদের অন্তর্ভুক্ত হয়ে পড়ে। সূরা মায়িদা (৫) : ২৭-৩০

পবিত্র কুরআনের বর্ণনানুসারে, এই হচ্ছে পৃথিবীতে সংঘটিত প্রথম হত্যা। পৃথিবীর ইতিহাসের প্রথম অপরাধ। প্রথম এই হত্যাকার পেছনের কারণও আমরা উপরোক্ত আয়াতসমূহে দেখতে পাই, তোমার কুরবানী কবুল হয়েছে আর আমারটি হয়নি’ এই চিন্তা থেকেই কাবীলের মনে হিংসা জমাট বাঁধতে থাকে আর এর পরিণতিতেই সে তার ভাই হাবীলকে হত্যা করে। যে হিংসা মানুষকে দিয়ে পৃথিবীতে পাপের সূচনা করাল, সে-ই হিংসা জগতে আরও কত শত-সহ; অনিষ্ট ঘটিয়েছে তার হিসাব কে জানে!

ইতিহাসের আরও পেছনের পাতায় আদম আলাইহিস সালামকে সিজদা করতে অস্বীকৃতি জানিয়ে ইবলিসের যে ঔদ্ধত্য ও অহংকারের ঘটনা বর্ণিত হয়েছে, উল্লেখিত হয়েছে তার অভিশপ্ত হওয়ার কথা, তার মূলেও তো একই হিংসা। কুরআনের ভাষায়

قَالَ اَرَءَیْتَكَ هٰذَا الَّذِیْ كَرَّمْتَ عَلَیَّ.

সে বলল, দেখুন তো, এই কি সেই সৃষ্টি, যাকে আপনি আমার ওপর মর্যাদা দান করেছেন? সূরা ইসরা (১৭) : ৬২

ফলাফল তো এই আকাশের প্রথম অপরাধ আর জমিনের প্রথম অপরাধ সবটার মূলেই এই হিংসা। এর জঘন্যতা তাই আর বুঝিয়ে বলার অপেক্ষা রাখে না। প্রশ্ন হল, হিংসা কী?

হিংসা:
হাসাদ(حسد) আৱবী শব্দ যার আভিধানিক অর্থ হিংসা, ঈর্ষা, পরশ্রীকাতরতা ইত্যাদি। পরিভাষায় বলা হয় যে, কারো উন্নতি বা ভাল অবস্থা দেখে তা অসহ্য হওয়া এবং মনে মনে এই কামনা করা যে, তাঁর এ ভাল অবস্থা না থাকুক।মানুষের ভাল অবস্থা দর্শনে অন্তরে দুই প্রকার হালত পয়দা হয়ে থাকে। এক প্রকারের নাম হলো হাসাদ তথা হিংসা অন্য প্রকার হলো গীবতা।

হাসাদ হলো অপরের ভাল দেখে মনে মনে তার অমঙ্গল কামনা ও অকল্যাণ কামনা করা এবং হিংসা করা। গীবতা (غبط) শব্দটি আরবী। যার আভিধানিক অর্থ হলো অন্যের ন্যায় সুখ কামনা করা, ঈর্ষা, সুখ, খুশি, আনন্দ ইত্যাদি। আর যদি ভাল অবস্থা দেখে মনে মনে এই কামনা করে যে, আমারও এরূপ ভাল অবস্থা হাসিল হউক, তাহলে তাকে গীবতা বলে।
কারো কল্যাণ ও ভালো কিছু দেখে তার ক্ষতির চিন্তা না করে তার অনুরূপ বা তার চেয়ে বেশি কল্যাণ প্রত্যাশা করা এবং তা অর্জনের চেষ্টা-সাধন করাকে ঈর্ষা (غبطة) বলা হয়। এটি জায়েয়। এতে ভালো কাজের প্রতিযোগিতা সৃষ্টি হয় এবং সমাজে কল্যাণ ও সৎকর্মের বিস্তৃতি ঘটে।
সুতরাং হিংসা নয়; ঈর্ষা করুন। কারো ক্ষতি নয় বরং কল্যাণ অর্জনে প্রতিযোগিতা করুন।:

হিংসা করার কারণসমূহ:
ইমাম গাজ্জালী (রহ.) হিংসার সাতটি কারণ উল্লেখ করেছেন : ১. শত্রুতা ২. নিজের ওপর অন্য কেউ সম্মানিত হয়ে যাওয়া ৩. অহংকার ৪. অস্বাভাবিকভাবে কেউ এগিয়ে যাওয়া। ৫. নিজের পদ বা মর্যাদা হারিয়ে যাওয়ার ভয় করা। ৬. নেতৃত্ব ও সম্মানের লোভ ৭. নিচু বা খারাপ মানসিকতা৷

বিভিন্ন গ্রন্থাদি ও মুসলিম মনীষীদের গবেষণার ফলে হিংসার নিম্নোক্ত কারণগুরো খুঁজে বের করা হয়েছে। যেমন :
আদাওয়াত। তথা শত্রুতার কারণে অন্তরে হিংসা পয়দা হয়ে থাকে।
সমশ্রেণী লোকদের উন্নতি দর্শনে অন্তরে হিংসা পয়দা হয়ে থাকে।
হিকারাত। অর্থাৎ যাকে হিকারাতের তথা অবজ্ঞার চোখে দেখা হয় হতো তার উন্নতি দর্শনে অন্তরে হিংসার পয়দা হয়।
তায়াজ্জুব। অর্থাৎ যার উন্নতি কল্পনা ছিল না, তাঁর উন্নতি দর্শনে হিংসা পয়দা হয়ে থাকে।
ইচ্ছা পুরণ না হওয়ার ভয় হলে।
মহব্বতে রিয়াসাতের জন্য অন্তরে হিংসার পয়দা হয়ে থাকে।
খুবস ও বুখলে নফসের কারণে অন্তরে হিংসার উৎপত্তি হয়ে থাকে। ইবনুল কায়্যিম আল-জাওজীর, কিতাবুর রূহ, পৃ. ৩৭৩-৩৭৪; ইমাম ইবনে তাইমিয়্যাহর, মাজমাউল ফাতাওয়া, খণ্ড ১০, পৃ. ১২৪-১২৫; ইবনে হাজার আসকালানীর, ফাতহুল বারী, খণ্ড ১০, পৃ. ৪৮১।

হিংসা সম্পর্কে কোরান হাদীসঃ
এই হিংসার বিরুদ্ধে পবিত্র কোরআনের শক্ত অবস্থান৷ হিংসার নিন্দায় কোরআন বলেছে৷

وَمِن شَرِّ حَاسِدٍ إِذَا حَسَدَ

আর হিংসুকের অনিষ্ট থেকে পানাহ চাই, যখন সে হিংসা করে।’ (সুরা ফালাক :৫)
النساء ٤:٥٤

أَمْ يَحْسُدُونَ ٱلنَّاسَ عَلَىٰ مَآ ءَاتَىٰهُمُ ٱللَّهُ مِن فَضْلِهِۦۖ فَقَدْ ءَاتَيْنَآ ءَالَ إِبْرَٰهِيمَ ٱلْكِتَٰبَ وَٱلْحِكْمَةَ وَءَاتَيْنَٰهُم مُّلْكًا عَظِيمًا

পবিত্র কোরআনে আল্লাহ তাআলা সতর্ক করে বলেছেন, ‘আল্লাহ নিজ অনুগ্রহে মানুষকে যা দিয়েছেন, সে জন্য কি তারা তাদের ঈর্ষা করে?’ (সূরা আন-নিসা, আয়াত: ৫৪)

Sunan Abi Da’ud Book: 43, Hadith: 4903

حَدَّثَنَا عُثْمَانُ بْنُ صَالِحٍ الْبَغْدَادِيُّ، حَدَّثَنَا أَبُو عَامِرٍ، – يَعْنِي عَبْدَ الْمَلِكِ بْنَ عَمْرٍو – حَدَّثَنَا سُلَيْمَانُ بْنُ بِلاَلٍ، عَنْ إِبْرَاهِيمَ بْنِ أَبِي أَسِيدٍ، عَنْ جَدِّهِ، عَنْ أَبِي هُرَيْرَةَ، أَنَّ النَّبِيَّ صلى الله عليه وسلم قَالَ ‏”‏ إِيَّاكُمْ وَالْحَسَدَ فَإِنَّ الْحَسَدَ يَأْكُلُ الْحَسَنَاتِ كَمَا تَأْكُلُ النَّارُ الْحَطَبَ ‏”‏ ‏.‏ أَوْ قَالَ ‏”‏ الْعُشب.

মহানবী (সা.) বলেছেন, ‘তোমরা হিংসা থেকে বেঁচে থাকো। কেননা হিংসা পুণ্যকে এমনভাবে বিনষ্ট করে দেয়, যেভাবে আগুন কাঠকে ভস্মীভূত করে দেয়।’ (আবু দাউদঃ৪৯০৩)

قال رسول الله صلي الله عليه و سلم.إِنّ الْحَسَدَ يُطْفِئُ نُورَ الْحَسَنَاتِ.

সন্দেহ নেই, হিংসা নেক আমলসমূহের নূর ও আলোকে নিভিয়ে দেয়। (সুনানে আবু দাউদ, হাদীস ৪৯০৬)

وقال رسول الله صلي الله عليه و سلم :دَبّ إِلَيْكُمْ دَاءُ الأُمَمِ قَبْلَكُمْ: الحَسَدُ وَالبَغْضَاءُ…

পূর্ববর্তী জাতিসমূহের রোগব্যাধি তোমাদের কাছেও এসে পৌঁছেছে। তা হল হিংসা-বিদ্দেশ৷(জামে তিরমিযী, হাদীস ২৫১০)

لاَ تَقَاطَعُوا وَلاَ تَدَابَرُوا وَلاَ تَبَاغَضُوا وَلاَ تَحَاسَدُوا وَكُونُوا عِبَادَ اللهِ إِخْوَانًا.

তোমরা পরস্পর বিচ্ছিন্ন হয়ো না, একে অন্যের পেছনে লেগে থেকো না, একে অন্যের প্রতি হিংসা-বিদ্বেষ পোষণ করো না। বরং তোমরা আল্লাহর বান্দা হয়ে যাও, পরস্পর ভাই-ভাই হয়ে যাও। জামে তিরমিযী, হাদীস ১৯৩৫
মুসলিম: ২৫৬৪

হিংসা ও ঈমান :

الإمام باقر (ع) : إنّ الحسد يأکل الإيمان کما تأکل النار الحطب

ইমাম বাকির (আঃ) বলেছেন : ‘নিশ্চয়ই যেভাবে আগুন কাঠকে ভক্ষণ করে [জ্বালিয়ে নিঃশ্বেষ করে], হিংসাও ঈমানকে ভক্ষণ করে’। (আল কাফী, খণ্ড ২, পৃষ্ঠা ৩০৬, হাদীস নং ১)

হিংসা তাই সর্বাবস্থায় পরিত্যাজ্য। এ হিংসা কোনো মুমিনের চরিত্র হতে পারে না। হাদীসের বক্তব্য এমনই

لَا يَجْتَمِعَانِ فِي قَلْبِ عَبْدٍ الْإِيمَانُ وَالْحَسَدُ.

কোনো বান্দার হৃদয়ে ঈমান ও হিংসা একত্রিত হতে পারে না। সুনানে নাসাঈ, হাদীস ৩১০৯

الإمام الصادق (ع) : إياکُم أن يحسُدَ بعضکم بعضاً؛ فإنَّ الکفرَ أصله الحسد.

ইমাম সাদিক (আঃ) বলেছেন :
‘একে অপরের সাথে হিংসা করা থেকে বিরত থাকো, কেননা হিংসা হল কুফরের ভিত্তি স্বরূপ’। (আল কাফী, খণ্ড ৮, পৃ. ৮, হাদীস নং ১)

হিংসার হুকুম:
আমরা যেসব কাজ করি, তার মধ্যে কিছু কাজ পুণ্যের, আর কিছু কাজ পাপের। পুণ্য ও পাপের কিছু কাজ প্রকাশ্য, আবার কিছু কাজ অপ্রকাশ্য। অপ্রকাশ্য পাপ কাজের মধ্যে হিংসা অন্যতম। হিংসা এমন নীরব অনল, যা ক্রমে ক্রমে জ্বলে ওঠে এবং মানুষের নেক আমল ধ্বংস করে দেয়। অথচ মানুষের কোনো খবর থাকে না যে তার ভালো আমল নিঃশেষ হয়ে যাচ্ছে।

হাসাদ তথা হিংসা করা হারাম। প্রকাশ থাকে যে, গোমরাহ পীর ও গোমরাহ্ আলিমগণ যে নিয়ামত দ্বারা গোমরাহীর কাজ বিস্তার করে উক্ত নিয়ামত ধ্বংসর কামনা করা জায়েয এবং ফাসিক লোকরা যে নিয়ামত দ্বারা বেশরা কাজ বিস্তার করে উহাতে হিংসা জায়িয। যে নিয়ামত দর্শনে গীবতার উদয় হয় উক্ত নিয়ামত যদি দ্বীনি নিয়ামত হয় এবং হাসিল করা ওয়াজিব হয়, যেমন : ঈমান, নামায, যাকাত ইত্যাদি তবে গীবতা করা ওয়াজিব। আর যদি উক্ত নিয়ামত নফল হয়, তবে সে গীবতা করা মুস্তাহাব। আর যদি উক্ত নিয়ামত দুনিয়াবী হয়ে থাকে তাহলে তা মুবাহ। দাওয়াউল হাসাদ ওয়া আছরুহু আল ত্বালাবাতিল ইলমি, খণ্ড ১, পৃ. ৪৫।

হিংসা থেকে বেঁঁচে থাকা ফরজ : মানুষের মধ্যে হিংসা নামক ব্যাধি কার্যকলাপে লুকিয়ে আছে। খুব কমসংখ্যক ব্যক্তিই এ ব্যাধি থেকে বাঁচতে পারে। অথচ হিংসা থেকে বেঁচে থাকা ফরজ। মহানবী (সা.) বলেছেন, ‘তোমরা পরস্পর হিংসা-বিদ্বেষ ও শত্রুতা পোষণ কোরো না ও অন্যের দোষ চর্চা কোরো না।’ (সহিহ মুসলিম)

হিংসুকের আলামত :
১. অন্যের ভালো অবস্থা দেখে তাকে শত্রু ভাবা। ২. তার প্রতি অসন্তুষ্ট হওয়া। ৩. অন্যের কল্যাণের কারণে সব সময় অন্তরে এক ধরনের কষ্ট ও ব্যথা অনুভব করা। ৪. যার প্রতি হিংসা করে তার কাছ থেকে নিয়ামত চলে গেলে আনন্দিত হওয়া যদিও এতে তার কোনো লাভ বা ক্ষতি না থাকা। ৫. সব সময় এ ব্যাপারে সতর্ক ও দুশ্চিন্তাগ্রস্ত থাকে যেন কোনোভাবেই চলে যাওয়া সেই নিয়ামত আর ফিরে না আসে।

الإمام الصادق (ع) : قال لُقمان (ع) لابنه: و للحاسد ثلاثُ علاماتٍ: يغتبُ إذا غابَ وَ يَتملّقُ إذا شهَدَ وَ يَشمَتُ بَالمُصيبةِ.

হযরত লোকমান (আঃ) স্বীয় পুত্রকে বললেন : ‘হিংসুকের তিনটি চিহ্ন রয়েছে : পিঠ-পিছনে গীবতকরে, সামনা সামনি তোষামোদ করে এবং অন্যের বিপদে আনন্দিত হয়।’ (আল খেসাল, পৃষ্ঠা ১২১, হাদীস নং ১১৩)

শিক্ষণীয় ঘটনা :
আনাস ইবনে মালিক (রা.) থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, একদিন আমরা রসুল (সা.)-এর কাছে বসা ছিলাম। রসুল (সা.) একটি গলির দিকে ইঙ্গিত করে বললেন, এই গলি দিয়ে এখন একজন জান্নাতি লোক বেরিয়ে আসবে। অতঃপর দেখলাম সেদিক দিয়ে এক আনসারি সাহাবি তার নাম সা’আদ ইবনে আবি ওয়াক্কাস (রা.) তিনি বের হয়ে এলেন। তার দাড়ি থেকে তখন অজুর পানি গড়িয়ে পড়ছিল। তিনি সবাইকে সালাম দিলেন, অন্য আরেক দিনও রসুল (সা.) এভাবে বললেন এবং সেই লোকটিই বেরিয়ে এলেন। এভাবে তিন দিন এমন হলো। তৃতীয় দিন রসুল (সা.) মজলিস থেকে উঠে যাওয়ার পর আবদুল্লাহ ইবনে আমর ইবনুল আস (রা.) ওই সাহাবিকে অনুসরণ করলেন, আমার পিতার সঙ্গে ঝগড়া হয়েছে এ কারণে বাড়িতে যাব না বলে শপথ নিয়েছি। যদি আপনি ভালো মনে করেন, আমাকে আপনার সঙ্গে তিন দিন থাকতে অনুমতি দিন। তিনি রাজি হলেন, আবদুল্লাহ (রা.) বলেন, আমি তার সঙ্গে তিন দিন থাকলাম। তাকে এমন বিশেষ কোনো আমল করতে দেখিনি। তবে যখনই তার ঘুম ভাঙত তিনি জিকির করতেন। আর একটি হলো আমি তাকে ভালোটি ছাড়া কোনো মন্দ কাজ করতে দেখিনি। তিন দিন পর আমি তাকে সব খুলে বললাম এবং জানতে চাইলাম আপনার কাছে তো এমন কোনো বিশেষ আমল পেলাম না যার কারণে আপনি জান্নাতের এমন সুসংবাদ পেতে পারেন। তখনই ওই সাহাবি বললেন, আপনি ঠিক বলেছেন আমার বিশেষ কোনো আমল নেই তবে আমি কখনো আমার অন্তরে কারও ব্যাপারে হিংসা বিদ্বেষ অনুভব করি না। তখন আবদুল্লাহ (রা.) বললেন হ্যাঁ, এই আমলই আপনাকে ওই মর্যাদায় পৌঁছে দিয়েছে। (মুসনাদে আহমাদ)

হিংসার পরিণাম:
হিংসার পরিণাম সম্পর্কে ইমাম জাফর সাদিক (রহ.) বলেন, ‘হিংসা হলো কুফরের ভিত্তিস্বরূপ।’ (আল কাফি)। ইমাম বাকের (রহ.) বলেন, ‘হিংসা ইমানকে জ্বালিয়ে নিঃশেষ করে দেয়।’ (আল কাফি)। লোকমান হাকিম স্বীয় পুত্রকে বলেন, ‘বৎস শোনো! হিংসুকের তিনটি চিহ্ন আছে— ১. সে হিংসা করে এবং পেছনে গিবত করে। ২. সামনে তোষামোদ করে এবং ৩. মানুষের বিপদে আনন্দিত হয়। (খোলাসা)। আদম (আ.)-এর প্রতি হিংসার বশবর্তী হয়েই ইবলিশ আল্লাহর অবাধ্য হয়েছিল। তাই কেউ যদি হিংসাপ্রবণ মানুষে পরিণত হয় বা কারও প্রতি হিংসা করে তবে সেও আল্লাহর নিয়ামত থেকে চিরবঞ্চিত হবে। তাই হিংসা থেকে বেঁচে থাকা আমাদের সবার একান্ত কর্তব্য।
শত্রুতার কারণে হিংসার জন্ম হয়। পরিণতিতে অনেক সময় ভয়াবহ দ্বন্দ্ব-কলহ ও খুনাখুনির মতো অবস্থার সৃষ্টি হয়। প্রতিপক্ষের নিয়ামত বিলোপ সাধনের ফন্দি-ফিকিরে জীবন ও সময় ব্যয় হয়। কখনো কখনো প্রতিপক্ষের দোষ চর্চা ও মানহানির চেষ্টা চালানো হয়। হিংসার আগুন আত্মীয়-স্বজন, বন্ধু-বান্ধব, ভাই-ভাইয়ের মধ্যে প্রজ্বলিত হয়ে ওঠে। হিংসার উপাদানের উপস্থিতি যেখানে যত বেশি ঘটবে, হিংসাও সেখানে সেই পরিমাণ প্রবল আকারে পাওয়া যাবে।

হিংসার প্রতিকার :
মানুষের আত্মার ব্যাধিগুলোর অন্যতম ব্যাধি হলো হিংসা। আত্মার এ রোগের প্রতিকার কয়েকটি বিষয়ে খেয়াল রাখা চাই:
১/ইলম ও আমল দ্বারা সম্ভব। যে ইলম দ্বারা হিংসার চিকিৎসা করা যায়, তা হলো—এ কথা নিশ্চিতভাবে জানা যে হিংসা একটি মারাত্মক রোগ। এ হিংসার ফলে হিংসুকের দুনিয়া ও আখিরাত উভয়ই ক্ষতিগ্রস্ত হয়। অথচ যার প্রতি হিংসা করা হয়, তার ইহলৌলিক ও পারলৌকিক কোনো ক্ষতি হয় না, বরং এ হিংসার ফলে সে লাভবান হয়। কেউ এ কথা দৃঢ়ভাবে বিশ্বাস করলে তার জন্য হিংসা ত্যাগ করা সহজ হবে।

২/হিংসার ভিত্তি হলো দুনিয়ায় প্রেম ও সম্পদের মোহ। ফলে ব্যক্তি যদি অন্তর থেকে দুনিয়ায় প্রেম ও সম্পদের লোভ-লালসা বের করে দিতে পারে, তাহলে হিংসার রোগ থেকে আরোগ্য লাভ করবে।
আব্দুর রহমান ইবন মু‘আবিয়া রা. হতে বর্ণিত; নবী করীম সা. বলেছেন: “তিনটি দূষণীয় কাজ থেকে কেউ মুক্তি পায় না : এক. খারাপ ধারণা, দুই. হিংসা, তিন. অশুভ ফলাফলের ধারণা।জনৈক সাহাবী জিজ্ঞেসা করলেন : হে আল্লাহর রাসূল সা.! এগুলো থেকে বিরত থাকার উপায় কী? রাসূল সা. বললেন : মনে মনে কাউকে হিংসা করলে কাজে কর্মে তা প্রকাশ না করা, কারো সম্পর্কে খারাপ ধারণা করলে তা সত্য বলে বিশ্বাস না করা এবং অশুভ ফলাফলের ধারণার কারণে কাজ থেকে ফিরে না আসা।মাজমা‘উয যাওয়ায়িদ – আল-হাইছামী,

৩/ইলমী ইলাজ (علاج العلمي) : যার উন্নতি সাধিত হয়েছে এবং তা দর্শনে মনে হিংসার উদয় হয়েছে তার সম্বন্ধে এ ধারণা করা যে, এ ব্যক্তির তাকদীরে উন্নতি লেখা আছে বলেই উন্নতি হয়েছে। এক্ষণে এ ব্যক্তি সাথে হিংসা করলে আল্লাহর তাকদীর অস্বীকার করার মত গোনাহ হবে।

৪/আমলী ইলাজ (علاج العملي) : অর্থাৎ যার সাথে হিংসার ভাব উদয় হয়েছে তাঁর সাথে ভাল ব্যবহার করা এবং তাঁর প্রশংসা করা। তাহলে দেখা যাবে যে, অন্তর থেকে হিংসার বীজ চিরতরে নি:শেষ হয়ে যাবে।
৫/বেশি সালাম দেওয়া ৷সালামের প্রচলন যখন বেশি হবে পারস্পরিক হৃদ্যতা ও ভালোবাসা তখন সৃষ্টি হবেই। আর হৃদয় দিয়ে যখন কেউ কাউকে ভালোবাসতে পারবে, তখন আর তার ভালো কোনো কিছু দেখে সে কুঞ্চিত হবে না, তার মনে হিংসা দানা বাঁধবে না, বন্ধুর ভালো জিনিসটির বিনাশ কামনা করবে না। তাই কারও প্রতি যদি মনে হিংসা জন্ম নেয় বিশেষভাবে তার সঙ্গে যদি সালাম-কালাম বাড়িয়ে দেয়া যায়, মহব্বত সৃষ্টির লক্ষ্যে তাকে কিছু হাদিয়া দেয়া যায় তাহলে তা হিংসার ঘায়ে মলমের মতো কাজ করতে পারে।

৬/ মনকে হিংসামুক্ত রাখার জন্যে প্রিয় নবীজী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের এ দুআটিও সবিশেষ উল্লেখযোগ্য

رَبِّ تَقَبّلْ تَوْبَتِى وَاغْسِلْ حَوْبَتِى وَأَجِبْ دَعْوَتِى وَثَبِّتْ حُجّتِى وَاهْدِ قَلْبِى وَسَدِّدْ لِسَانِى وَاسْلُلْ سَخِيمَةَ قَلْبِى.

প্রভু আমার! আপনি আমার তওবা কবুল করুন, আমার পাপরাশি ধুয়ে দিন, আমার ডাকে সাড়া দিন, আমার দলীল-প্রমাণ প্রতিষ্ঠিত করুন, আমার অন্তরকে সঠিক পথে পরিচালিত করুন, আমার যবানকে সঠিক রাখুন আর আপনি আমার অন্তরের যাবতীয় কলুষতা দূর করে দিন। Ñসুনানে আবু দাউদ, হাদীস ১৫১২

উপসংহার:
আল্লাহ তায়ালা আমাদেরকে হিংসা থেকে ৱক্ষা করূন৷আমীন৷

Unknown's avatar

Author:

Md. Mohsin Hossain (Arabic: محمد محسن حسين), born 2003 in Tangail,Dhaka,Bangladesh is a Quran reciter, imam, muazzin, preacher and Nasheed artist & Graphic Designer. He studied up to Najrana in Hafez Madrasa in 2012. He studied at Fajargonj Alim Madrasa Secondary School in Tangail, Bangladesh. He is now joining the Faculty of Computer Technology at Tangail Polytechnic Institute (Tangail).He has been serving as a muazzin in a mosque in a town in Tangail for 3 years and is currently promoting graphic design as well as Quran and Nasheed singer. Spotify, iTunes, YouTube Music, Deezer and YouTube channels.

Leave a comment