ঈদেৱ বয়ান | কোরবানীর তাৎপর্য৷

ঈদেৱ বয়ান

বিষয়:
কোরবানীর তাৎপর্য৷

ভুমিকা৷
পৃথিবীর সর্বপ্রথম কোরবানী৷
কোরবানী প্রত্যেক যুগেই ছিল৷
হযরত ইবরাহীম (আ:)র কুরবানী৷
প্ৰাকৃতিৱ ৩টি মলনীতি।
কুৱবানীৱ মুল তাৎপর্য।
কোৱবানী ও অন্নান্য ইবাদতে মুল হলো তাকওয়া।
তাকওয়ার গুরুত্ব ও তাৎপর্য ৷
খোদাভীতির একটি দৃষ্টান্ত৷
হাবিল (আঃ)এৱ তাকওয়া।
ইব্ৰাহিম (আঃ)এৱ ঘটনায় তাকওয়া।
সবখানে তাসহিহে নিয়্যাতেৱ গুৱত্ব।
বিশুদ্ধ নিয়তের বিস্ময়কর ঘটনা৷
কুরবানীর উদ্দেশ্য কী?
ঈদের নামায৷
উপসংহার৷

ভুমিকা:
আল্লাহর কাছে প্রিয় আমলগুলোর একটি হলো কুরবানী৷এই ত্যাগের উৎসব হযরত ইব্রহীম (আ:)এর তরীকা ৷যাতে তিনি তাকওয়ার উচ্চ শিকরে উঠেছিলেন৷তাই আমাদের উপরও তা অর্জন করা চাই৷

পৃথিবীর সর্বপ্রথম কোরবানী:
কোরবানীর ইতিহাস খুবই প্রাচীন। সেই আদি পিতা হজরত আদম (আ.) এর যুগ থেকেই কোরবানীর বিধান চলে আসছে। আদম (আ.) এর দুই ছেলে হাবীল

ও কাবীলের কোরবানী পেশ করার কথা আমরা মহাগ্রন্থ আল-কোরআন থেকে জানতে পারি।

মহান আল্লাহ সুবহানাহু তাআলা বলেন,

وَٱتۡلُ عَلَيۡهِمۡ نَبَأَ ٱبۡنَيۡ ءَادَمَ بِٱلۡحَقِّ إِذۡ قَرَّبَا قُرۡبَانٗا فَتُقُبِّلَ مِنۡ أَحَدِهِمَا وَلَمۡ يُتَقَبَّلۡ مِنَ ٱلۡأٓخَرِ قَالَ لَأَقۡتُلَنَّكَۖ قَالَ إِنَّمَا يَتَقَبَّلُ ٱللَّهُ مِنَ ٱلۡمُتَّقِينَ

অর্থ: আদমের দুই পুত্রের (হাবিল ও কাবিলের) বৃত্তান্ত তুমি তাদেরকে যথাযথভাবে শুনিয়ে দাও, যখন তারা উভয়ে কোরবানী করেছিল, তখন একজনের কোরবানী কবুল হলো এবং অন্যজনের কোরবানী কবুল হলো না। তাদের একজন বলল, ‘আমি তোমাকে অবশ্যই হত্যা করব। অপরজন বলল, ‘আল্লাহ তো সংযমীদের কোরবানীই কবুল করে থাকেন। (সূরা মায়িদা (৫):২৭)

যখন আদম ও হাওয়া (আ.) পৃথিবীতে আগমন করেন এবং তাদের সন্তান প্রজনন ও বংশ বিস্তার আরম্ভ হয়, তখন হাওয়া (আ.) এর প্রতি গর্ভ থেকে জোড়া জোড়া (জময) অর্থাৎ একসাথে একটি পুত্র ও একটি কন্যা এরূপ জময সন্তান জন্মগ্রহণ করত। কেবল শীস (আ.) ব্যতিরেকে। কারণ, তিনি একা ভূমিষ্ঠ হয়েছিলেন।

তখন ভাই-বোন ছাড়া আদম (আ.) এর আর কোনো সন্তান ছিল না। অথচ ভাই-বোন পরস্পর বিবাহ বন্ধনে আবদ্ধ হতে পারে না। তাই মহান আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তাআলা উপস্থিত প্রয়োজনের খাতিরে আদম (আ.) এর শরীয়তে বিশেষভাবে এ নির্দেশ জারি করেন যে, একই গর্ভ থেকে যে যমজ পুত্র ও কন্যা জন্মগ্রহণ করবে, তারা পরস্পর সহোদর ভাই-বোন হিসেবে গণ্য হবে। তাদের মধ্যে বৈবাহিক সম্পর্ক হারাম।

কিন্তু পরবর্তী গর্ভ থেকে জন্মগ্রহনকারী পুত্রের জন্য প্রথম গর্ভ থেকে জন্মগ্রহণকারীনি কন্যা সহোদরা বোন হিসেবে গণ্য হবে না। তাদের মধ্যে পরস্পর বিবাহ বন্ধনে আবদ্ধ হওয়া বৈধ। সুতরাং সে সময় আদম (আ.) একটি জোড়ার মেয়ের সাথে অন্য জোড়ার ছেলের বিয়ে দিতেন।

ঘটনাক্রমে কাবীলের সাথে যে সহোদরা জন্ম নিয়েছিল সে ছিল পরমা সুন্দরী। তার নাম ছিল আকলিমা। কিন্তু হাবিলের সাথে যে সহোদরা জন্ম নিয়েছিল সে দেখতে অতটা সুন্দরী ছিল না। সে ছিল কুশ্রী ও কদাকার। তার নাম ছিল লিওযা।

বিবাহের সময় হলে শরয়ী ‘নিয়মানুযায়ী হাবীলের সহোদরা কুশ্রী বোন কাবীলের ভাগে পড়ল। ফলে আদম (আ.) তৎকালীন শরীয়তের আইনের পরিপ্রেক্ষিতে কাবীলের আবদার প্রত্যাখ্যান করলেন এবং তাকে তার নির্দেশ মানতে বললেন। কিন্তু সে মানল না। এবার তিনি তাকে বকাঝকা করলেন। তবুও সে ঐ বকাঝকায় কান দিল না।

অবশেষে আদম (আ.) তার এ দুই সন্তান হাবীল ও কাবীলের মতভেদ দূর করার উদ্দেশ্যে বললেন, ‘তোমরা উভয়ে মহান আল্লাহর উদ্দেশ্যে কোরবানী পেশ কর, যার কোরবানী গৃহীত হবে, তার সাথেই আকলিমার বিয়ে দেয়া হবে।’ সে সময় কোরবানী গৃহীত হওয়ার একটি সুস্পষ্ট নিদর্শন ছিল যে, আকাশ থেকে একটি অগ্নিশিখা এসে সে কোরবানীকে ভষ্মীভূত করে ফেলত। আর যার কোরবানী কবুল হতো না তারটা পড়ে থকত।

যাহোক, তাদের কোরবানীর পদ্ধতি সম্পর্কে যা জানা যায় তা হলো- কাবীল ছিল চাষী। তাই তিনি গমের শীষ থেকে ভালো ভালো মালগুলো বের করে নিয়ে বাজে মালগুলোর একটি আটি কোরবানীর জন্য পেশ করল। আর হাবীল ছিল পশুপালনকারী। তাই সে তার জন্তুর মধ্যে থেকে সবচেয়ে সেরা একটি দুম্বা কোরবানীর জন্য পেশ করল। এরপর নিয়মানুযায়ী আকাশ থেকে অগ্নিশিখা এসে হাবীলের কোরবানীটি ভষ্মীভুত করে দিল।

(ফতহুল ক্বাদীরের বর্ণনায় পাওয়া যায় যে, হাবীলের পেশকৃত দুম্বাটি জান্নাতে উঠিয়ে নেয়া হয় এবং তা জান্নাতে বিচরণ করতে থাকে। অবশেষে ইসমাঈল (আ.)-কে ওই দুম্বাটি পাঠিয়ে বাঁচিয়ে দেয়া হয়।) আর কাবীলের কোরবানী যথাস্থানেই পড়ে থাকল। অর্থাৎ হাবীলেরটি গৃহীত হলো আর কাবীলেরটি হলো না।

কিন্তু কাবীল এ আসমানী সিদ্ধান্ত মেনে নিতে পারল না। এ অকৃতকার্যতায় কাবীলের দুঃখ ও ক্ষোভ আরো বেড়ে গেল। সে আত্মসংবরণ করতে পারল না এবং প্রকাশ্যে তার ভাইকে বলল, ‘আমি অবশ্যই তোমাকে হত্যা করব। হাবিল তখন ক্রোধের জবাবে ক্রোধ প্রদর্শন না করে একটি মার্জিত ও নীতিগত বাক্য উচ্চারণ করল, এতে কাবীলের প্রতি তার সহানুভূতি ও শুভেচ্ছা ফুটে উঠেছিল।

হাবীল বলেছিল, ‘ তিনি মুত্তাক্বীর কর্মই গ্রহণ করেন। সুতরাং তুমি তাক্বওয়ার কর্মই গ্রহণ করো। তুমি তাক্বওয়া অবলম্বন করলে তোমার কোরবানীও গৃহীত হতো। তুমি তা করোনি, তাই তোমার কোরবানী প্রত্যাখ্যাত হয়েছে। এতে আমার দোষ কোথায়?…..তবুও এক পর্যায়ে কাবীল হাবীলকে হত্যা করে ফেলল। (তাফসীর ইবনু কাসীর, দুররে মনসূর, ফতহুল বায়ান, ৩/৪৫ ও ফতহুল ক্বাদীর, ২/২৮-২৯)

কোরবানী প্রত্যেক যুগেই ছিল:
মহান আল্লাহ তাআলা বলেন,

وَلِكُلِّ أُمَّةٖ جَعَلۡنَا مَنسَكٗا لِّيَذۡكُرُواْ ٱسۡمَ ٱللَّهِ عَلَىٰ مَا رَزَقَهُم مِّنۢ بَهِيمَةِ ٱلۡأَنۡعَٰمِۗ فَإِلَٰهُكُمۡ إِلَٰهٞ وَٰحِدٞ فَلَهُۥٓ أَسۡلِمُواْۗ وَبَشِّرِ ٱلۡمُخۡبِتِين
َ অর্থ: প্রত্যেক উম্মতের জন্য আমি কোরবানীর বিধান রেখেছিলাম, যাতে তারা উক্ত পশু যবেহ করার সময় আল্লাহর নাম স্মরণ করে এ জন্য যে, তিনি চতুষ্পদ জন্তু থেকে তাদের জন্য রিযিক নির্ধারণ করেছেন। (সূরা হাজ্জ (২২):৩৪)

এ আয়াতের ব্যাখ্যায় আল্লামা নাসাফী ও যামাখশারী বলেন, ‘আদম (আ.) থেকে মুহাম্মাদ (সা.) পর্যন্ত প্রত্যেক জাতিকে মহান আল্লাহ তাআলা তার নৈকট্য লাভের জন্য কোরবানীর বিধান দিয়েছেন। (তাফসীরে নাসাফী ৩/৭৯; কাশশাফ, ২/৩৩)।

হযরত ইবরাহীম (আ:)র কুরবানী:

ইসলাম ধর্মের সর্বশেষ নবী হজরত মুহাম্মদ (স.) বলেছেন, কোরবানি হচ্ছে— হজরত ইবরাহিমের (আ.) সুন্নত। হজরত যায়েদ ইবনে আরকাম (রা.) হতে বর্ণিত আছে, তিনি বলেন, আমি আরজ করলাম, ইয়া রাসুলুল্লাহ (সা.)! এ কোরবানি কী? মহানবী (স.) এরশাদ করলেন, তোমাদের পিতা হজরত ইবরাহিমের (আ.) সালামের সুন্নত (সহিহ আবু দাউদ)।

মহান আল্লাহতায়ালার সম্মানিত নবী হযরত ইব্রাহীম (আঃ) ইরাকে ইসলাম প্রচারের কাজ করছিলেন। তৎকালীন অত্যাচারী বাদশাহ নমরুদ এতে ক্ষিপ্ত হয়ে পড়ে। সে বিভিন্নরকম অত্যাচার-নির্যাতন চালিয়ে যাচ্ছিল। এরকম প্রতিকূল পরিস্থিতিতে আল্লাহতায়ালার নির্দেশে হযরত ইব্রাহিম (আঃ) তাঁর স্ত্রী হযরত সারাকে সাথে নিয়ে শাম দেশে হিজরত করলেন। দুর্ভাগ্যক্রমে সেখানকার বাদশাহ ছিলো জালিম ও ভীষণ বদলোক। বাদশাহর লোকেরা হজরত ইব্রাহীম (আঃ) ও তাঁর সুন্দরী স্ত্রী হযরত সারার আগমনের সংবাদ বাদশাহর দরবারে পৌঁছে দিলে বাদশাহ তাদেরকে ধরে নিয়ে আসতে বলে। বাদশাহর লোকেরা হজরত ইব্রাহীম (আ.) ও তাঁর স্ত্রী সারাকে বাদশাহর দরবারে হাজির করে।

বাদশাহ হযরত ইব্রাহীম (আঃ) এর কাছে জানতে চায়, তার সাথে স্ত্রী লোকটি কে? ইব্রাহীম (আঃ) চিন্তা করলেন, স্ত্রী বললে হয়তো বা তাঁকে মেরে ফেলতে পারে, তাই তিনি বলেন, সে আমার দ্বীনি বোন। বাদশাহ হযরত ইব্রাহীম (আঃ) কে বন্দী করে, আর হযরত সারাকে বাদশাহর বদস্বভাব চরিতার্থ করার জন্যে রেখে দেয়। বাদশাহর কু-প্রস্তাবে হজরত সারা রাজি নাহলে, বাদশাহ তাঁকে হত্যার হুমকি দেয়।

অতঃপর হযরত সারা দু’রাকা’আত সালাত আদায় করার অনুমতি চাইলে বাদশাহ তাঁকে সালাত আদায়ের ব্যবস্থা করতে দেয়। হজরত সারা সালাত শেষে আল্লাহ দরবারে ফরিয়াদ করেন যেন আল্লাহ তায়ালা তাঁর সতীত্ব রক্ষা করেন। এরই মধ্যে বাদশাহ অত্যন্ত অসুস্থ ও দুর্বল হয়ে পড়ে। অবস্থা খারাপ দেখে আর বাদশাহর মৃত্যুর জন্য তার লোকেরা হজরত সারাকে দায়ী করবে ভেবে, হযরত সারা বাদশাহর সুস্থতার জন্য দোয়া করেন। একে একে তিন বার একই ঘটনা ঘটলে বাদশাহ হযরত সারার কাছে ক্ষমা প্রার্থনা করে। হযরত সারার সতীত্ব দেখে আর এক সতী নারী হযরত হাজেরাকে তাঁর দাসী হিসেবে দিয়ে তাঁদেরকে বিদায় করে দেয়।

হযরত সারা ও হযরত ইব্রাহীম (আঃ) মুক্ত হয়ে সে দেশে বসবাস শুরু করেন। হযরত সারা তাঁর দাসী হযরত হাজেরাকে হজরত ইব্রাহীম (আঃ)এর সাথে বিয়ে দেন। কারণ হজরত সারার বয়স তখন ৯০ বছর আর হজরত ইব্রাহীম (আঃ)এর বয়স তখন ১০০ বছর। তাদের বিয়ের দীর্ঘ সময় পার হলেও, তখনও হযরত সারা মা হতে পারেননি। তিনি ভাবলেন, শেষ বয়সে যদি আল্লাহ তায়ালা মেহেরবানি করে তাঁর স্বামী হজরত ইব্রাহীম (আঃ) কে কোনো সন্তান দান করেন। সে প্রার্থণা কবুল হল, তবে সন্তান জন্ম হল হজরত হাজেরার গর্ভে। হযরত ইব্রাহিম (আঃ) তাঁর নাম রাখলেন, ইসমাইল(আঃ); যিনি আল্লাহ’র রহমতে নিজেও একজন নবী হওয়ার সৌভাগ্য অর্জন করেন।

হযরত ইসমাইল (আঃ) এর জন্মের পর, হযরত ইব্রাহীম (আঃ) তাঁর স্ত্রী হযরত হাজেরা ও একমাত্র ছেলেকে আল্লাহতায়ালার নির্দেশে আরবের মক্কায় কাবা ঘরের নিকটবর্তী সাফা ও মারওয়া পাহাড়ের পাদদেশে নির্জন স্থানে সামান্য খেজুর ও এক মসক পানিসহ রেখে আসেন। হযরত ইব্রাহীম (আঃ) যখন তাঁদের এ অবস্থায় রেখে স্থান ত্যাগ করছিলেন, তখন হযরত হাজেরা প্রশ্ন করছিলেন, আপনি আমাদের এ নির্জন স্থানে রেখে চলে যাচ্ছেন ? হযরত ইব্রাহীম (আঃ) ক্ষীণকন্ঠে জবাব দিয়েছিলেন, হ্যাঁ। আবারো হযরত হাজেরা প্রশ্ন করলেন এটা কি আল্লাহ তায়ালার নির্দেশ ? হযরত ইব্রাহীম (আঃ) আবারও জবাব দিয়েছিলেন, হ্যাঁ। হযরত হাজেরা আল্লাহ তায়ালার ওপর ভরসা করে তাঁর শিশু সন্তানকে নিয়ে সেখানে অবস্থান করলেন।

হযরত হাজেরা ও তাঁর সন্তানের খাদ্য ও পানীয় যখন শেষ হয়ে গেল, তখন তিনি খাদ্য ও পানির সন্ধানে সাফা ও মারওয়া পাহাড়ে দৌড়াদৌড়ি শুরু করলেন। যখন নিরাশ হয়ে ফিরছিলেন, এভাবে ৭বার পানির জন্য ছুটাছুটি করেন। তখন তিনি দেখতে পেলেন তাঁর শিশু পুত্র ইসমাইল (আঃ) পায়ের গোড়ালি দ্বারা জমিনে আঘাত করলে মাটির নিচ থেকে পানির ফোয়ারা প্রবাহিত হতে লাগল। এ সেই ফোয়ারা বা কূপ যা বর্তমানে ‘জমজম’ নামে বিশ্ব মুসলিমের কাছে পরিচিত। সুপেয় পানীয় হিসেবে এই বিখ্যাত কূপের পানি পান করে পরিতৃপ্ত হন মুসলমানরা। এটা কাবাকে কেন্দ্র করে ও হযরত ইসমাইল (আঃ) এর উছিলায় আল্লাহ তায়ালার করুণায় সৃষ্টি হয়েছিল।

মা হাজেরা তাঁর পানির পাত্র পূর্ণ করে নিলেন আর নিজেও তৃপ্তির সাথে পানি পান করলেন। এতে হজরত হাজেরার ক্ষুধা নিবারণ হল ও তাঁর শিশু পুত্রের জন্যে প্রয়োজনীয় দুধেরও ব্যবস্থা হলো। হজরত হাজেরার সাফা ও মারওয়া পাহাড়ে ক্রমাগত ৭ বার দৌড়াদৌড়ি করার কারণে সে ঘটনাকে কেন্দ্র করে আল্লাহ সোবহানাহু ওয়া তায়ালা হজ ও ওমরাহ পালনকারীদের জন্যে সাফা মারওয়া পাহাড়ে ৭ বার দৌড়াদৌড়ি করার বিধান জারি করেছেন।

এরপর হযরত ইসমাইল (আঃ) এর যখন হাঁটা-চলা ও খেলাধুলা করার বয়স হল, তখন হযরত ইব্রাহীম (আঃ)কে স্বপ্নে আদেশ করা হল।

যিলহজ্জ মাসের রাত্রে তিনি সর্ব প্রথম স্বপ্ন দেখলেন। স্বপ্ন দেখার পর ঐ দিন সকাল থেকে সন্ধ্যা পর্যন্ত তিনি চিন্তায় বিভোর যে আল্লাহর পক্ষ থেকে সুস্বপ্ন না দুঃস্বপ্ন, অতঃপর ৯ম রাতে তিনি ঐ একই স্বপ্ন দেখেন তখন তিনি বুঝতে পারেন যে আল্লাহর পক্ষ থেকে একটি সত্যিকার স্বপ্ন। তার পর ১০ম রাত্রে আবার ঐ একই স্বপ্ন । তাই ঐ দিনে তিনি কুরবানী করতে উদ্যত হন পরপর ৩ রাত স্বপ্ন দেখার পর তার মনে যে প্রতিক্রিয়া সৃষ্টি হয় তারই পরিপ্রেক্ষিতে উক্ত ৩টি দিন বিশেষ নামে বিশেষিত হয়েছে-

যিল হজ্জের ৮ম দিনের নাম “ইয়াওমুত তারবিয়াহ” চিন্তাভাবনার দিন।

৯ম “ইয়াওমুল আরাফাহ” জানার দিন।

১০ম “ইয়াওমুন নাহর” কুরবানীর দিন।

আল্লাহ তায়ালা বলেন,
ইবরাহীম (আলাইহিস সালাম)-এর কুরবানীর ব্যাপারে বলেন,
(فَلَمَّا بَلَغَ مَعَهُ السَّعْيَ قَالَ يَا بُنَيَّ إِنِّي أَرَى فِي الْمَنَامِ أَنِّي أَذْبَحُكَ فَانظُرْ مَاذَا تَرَى قَالَ يَا أَبَتِ افْعَلْ مَا تُؤْمَرُ سَتَجِدُنِي إِن شَاء اللهُ مِنَ الصَّابِرِينَ- فَلَمَّا أَسْلَمَا وَتَلَّهُ لِلْجَبِينِ- وَنَادَيْنَاهُ أَنْ يَا إِبْرَاهِيمُ- قَدْ صَدَّقْتَ الرُّؤْيَا إِنَّا كَذَلِكَ نَجْزِي الْمُحْسِنِينَ- إِنَّ هَذَا لَهُوَ الْبَلَاء الْمُبِينُ- وَفَدَيْنَاهُ بِذِبْحٍ عَظِيمٍ – وَتَرَكْنَا عَلَيْهِ فِي الْآخِرِينَ)
অর্থাৎ, অতঃপর সে (ইসমাঈল) যখন পিতা (ইবরাহীমের)র সাথে চলা-ফিরার (কাজ করার) বয়সে উপনীত হল, তখন ইবরাহীম তাকে বলল, ‘হে বেটা! আমি স্বপ্নে দেখি যে, তোমাকে যবেহ করছি; এখন তোমার অভিমত কি দেখ।’
(হজরত ইসমাইল আঃ) বললেন, হে আমার পিতা! আপনি যে বিষয়ে আদিষ্ট হয়েছেন তা পালন করুন। আপনি আমাকে আল্লাহর মেহেরবানিতে ধৈর্যশীলদের একজন পাবেন। অতঃপর যখন তাঁরা দু‘জন একমত হলো আর আল্লাহ তায়ালার ইচ্ছার সামনে আত্মসমর্পণ করল এবং ইব্রাহীম (আ.) ইসমাইল (আ.) কে জবাই করার জন্যে কাত করে শুইয়ে দিলো; তখন আমি ইব্রাহীমকে ডাক দিয়ে বললাম, হে ইব্রাহীম, তুমি তোমার স্বপ্নকে সত্যে রূপ দিয়েছো। নিশ্চয়ই এটা ছিল ইব্রাহীম ও ইসমাইলের জন্যে একটা পরীক্ষা। অতঃপর আমি ইব্রাহীমকে দান করলাম একটি মহা কোরবানির পশু। অনাগত মানুষের জন্যে এ (কোরবানির) বিধান চালু রেখে, তাঁর স্মরণ আমি অব্যাহত রেখে দিলাম। শান্তি বর্ষিত হোক ইব্রাহীমের ওপর। আমি এভাবেই সৎপরায়ণ ব্যক্তিদের প্রতিদান দিয়ে থাকি।’(সূরা আস সফফাত-১০১-১০৯)

পুত্রকে কুরবানী করানো আল্লাহ তায়ালার মূল উদ্দেশ্য ছিলনা উদ্দেশ্য ছিল মুলত পিতা-পুত্রের পরীক্ষা নেওয়া এই স্বপ্ন দেখার পর ইব্রাহীম (আঃ) পুত্রকে কোরবানী করার জন্যে তার স্ত্রী বিবি হাজেরাকে বললেন ছেলে টাকে ভাল পোশাক পরিয়ে প্রস্তুুত করে দাও তাকে একটি কাজে নিয়ে যাব। এদিকে শয়তান বিবি হাজেরাকে ধোকা দিতে শুরু করে। এবং ছেলে ইসমাইল (আঃ) কেও ধোকা দিতে শুরু করে ঐতিহাসিকদের বর্ননা মতে শয়তান তিন বার হযরত ইব্রাহীম (আঃ) কে বিভ্রান্ত করার প্রচেষ্টা চালিয়েছিল, কিন্তুু প্রতি বারে তিনি ৭টি কঙ্কর মেরে শয়তান কে বিতাড়িত করেন। তার স্মৃতি আজও প্রতি বছর হজের সময় পালন করা হয়। হযরত ইব্রাহীম (আঃ) তার ছেলেকে বললেন হে বৎস আমি স্বপ্ন দেখতেছি যে, আমি যেন তোমাকে যবেহ/কুরবানী করছি। সুতারাং তোমার অভিমত কি ? সে বলল হে আমার পিতা আপনাকে যা আদেশ করা হয়েছে আপনি তাই করুন অবশ্যই আমাকে ধৈর্য্যশীলদের অর্ন্তভুক্ত পাবেন। (সুরা সাফফাত ১০২) এভাবে পিতা-পুত্রের সাওয়াল যওয়াবের পরে ছেলে যখন রাজি হয়ে গেল তখন মহান আল্লাহর সামনে নিজ কলিজার টুকরাকে ছিড়ে রেখে দিলেন।

পিতা এবং পুত্র উভয় যখন এক মত হলেন তখন পিতা হযরত ইব্রাহীম (আঃ) পুত্রকে কাত করে শুয়ালেন তখন পুত্র পিতাকে বললেন যে আপনি আমাকে চোখ দেখা অবস্থায় যবেহ করতে পারবেন না। কারন আপনার হয়তো ছেলের মায়া উথলে উঠতে পারে ফলে আপনার ছুরি নাও চলতে পারে আমি হয়ত অধৈর্য্য হয়ে ছটফট করব আপনার কাজে ব্যাঘাত ঘটবে। তাই আমাকে আপনি শক্ত করে বেধে নেন এবং আমাকে উপুড় করে শুইয়ে দিন। এবার ছেলেটির গলায় ছুরি চালাবার পালা। আল্লাহর হুকুমের কাছে আত্ন সমার্পনের মূর্ত প্রতীক ইব্রাহীমের হাতে যখন ছেলেটির ঘাড়ে ছুরি চালিয়ে দিল বিশ্ব জাহান তখন কেপে উঠল। সে কি এক অভিনব দৃশ্য। পৃথিবীর ইতিহাসে এ পর্যন্ত এমন কোন ঘটনা ঘটেনি যে পিতার হাতে পুত্রকে কুরবানী ভবিষ্যৎ আর এমন ঘটনা ঘটবে কিনা তাও কে বলতে পারে।

ঐতিহাসিক মিনা প্রান্তরে এ ঘটনা ঘটে। ইমাম সুদ্দী (রাঃ) বলেন একদিকে আল্লাহ হযরত ইব্রাহীম (আঃ) কে হুকুম দিয়েছেন নিজ হাতে তুমি তোমার প্রিয় পাত্র নিজ ছেলেকে কুরবানী কর বা যবেহ কর অন্য দিকে তিনি ছুরিকে নির্দেশ দিয়েছেন তুমি মোটেই কেটোনা ফলে ছুড়ি ও তার ঘাড়ের মাঝখানে আল্লাহর কুদরতে একটি পিতলের পাত আর সৃষ্টি করে। সে জন্য ইব্রাহিম (আঃ) বার বার ছুরি চালালেও কোন কাজ হচ্ছিলনা।

এ পরিস্তিতিতে বিশ্ব জগতের সবাই যখন হতভম্ভ এবং হতবাক ও শ্বাসরুদ্ধ তখন মহান আল্লাহ তার রহস্য ফাস করে দিয়ে জান্নাত থেকে জিব্রাইল (আঃ) এর মাধ্যমে একটি দুম্বা পাঠিয়ে দিলেন এবং ইসমাইলকে বাচিয়ে নিয়ে ইব্রাহিমের অজান্তে সে দুম্বাটি তার দ্বারা যবেহ করিয়ে দিয়ে ঘোষনা করলেন তখন আমি তাকে ডেকে বললাম: হে ইব্রাহীম তুমি স্বপ্নকে সত্য প্রমান করে দেখালে। আমি এই রূপেই খাটি বান্দাদের কে পুরস্কার দিয়ে থাকি। নিশ্চয়ই এটা ছিল একটি সু ¯পষ্ট পরীক্ষা। আর আমি তাকে মুক্ত করলাম এক মহান যবেহের বিনিময়। (সুরা সফফাত ১০৪-১০৭)

হযরত ইবনে আব্বাস (রাঃ) সহ অনেক মুফাসসিরীনদের এর মতে ইব্রাহীমের কাছে যে দুম্বাটি পাঠানো হয়েছিল সেটি জান্নাতে ৪০ বছর ধরে লালন পালন করা হয়েছিল। হযরত ইব্রাহিম (আঃ) যখন ইসমাইল কে যবেহ করেছিলেন। তখন জিব্রাইল (আঃ) বলেছিলেন আল্লাহু আকবার আল্লাহু আকবার। অত:পর ইব্রাহিম (আঃ) বলেন আল্লাহু আকবার। ওয়ালিল্লাহেল হামদ। তার পর থেকে এ তাকবীরটি চিরস্থায়ী সুন্নাতে পরিনত হয়। আর আল্লাহ বলেন আমি তার জন্য এ বিষয়টি ভবিষ্যৎ বংশধরদের মধ্যে প্রতিষ্ঠিত রাখলাম। সালাম বর্ষিত হোক ইব্রাহীমের উপর (সাফফাত-১০৮-১০৯)আল্লাহর ঘোষনা মোতাবেক তখন থেকে চলে আসছে এ ইব্রাহীম (আঃ) এর আদর্শের বাস্তবায়ন। তাই আজ পৃথিবীর লক্ষ লক্ষ মানুষ আল্লাহর হুকুমের প্রতি পালানের সাথে সাথে প্রতি বছর ইব্রাহিমের স্মৃতি পালন করে পাপ মোচন করছে। এবং ইব্রাহিম (আঃ) এর আদর্শ কে কিয়ামত পর্যন্ত চিরস্থায়ী করে দিয়েছেন। যা বিশ্বের তাওহীদ বাদীদের হৃদয় বিজয়ী।

এই সুমহান ঘটনাকে চিরস্মরণীয় করে রাখার জন্য এবং আল্লাহ’র উদ্দেশ্যে নিজের কুপ্রবৃত্তিকে বিসর্জন দেয়ার নিমিত্তে কোরবানি করাকে সামর্থবানদের জন্য ওয়াজিব করা হয়। যদিও কোরবানির মনস্তাত্ত্বিক, সামাজিক, অর্থনৈতিক সুফল আরো ব্যাপক ৷

প্ৰাকৃতিৱ ৩টি মলনীতিঃ
(১)ৱুহ মুল আৱ দেহ তাৱ সাথে শাখা।
(২)ৱুহ দেহেৱ সাথে টিকে থাকলে মুল জিনিস থাকে।
(৩)ৱুহেৱ উপৱ প্ৰভাব কৱতে হলে দেহতে কৱতে হয়।শৱীয়তেৱ ক্ষেত্ৰে ঐ তিনটি মুলনীতি প্ৰযোয্য।

কোৱবানীৱ মুল তাৎপর্যঃ
কোৱবানীৱ জানোয়াৱ হলো দেহেৱ মত ,আৱ তাকওয়া হল ৱুহেৱ মত ।যেমন ৱুহ ছাড়া দেহ কোনো উপকাৱেৱ বস্তু নয়‌।তেমন তাকওয়া ছাড়া কোৱবানী আল্লাহৱ দৱবাৱে দাম নেই।

কুরবানি হচ্ছে মনের তাকওয়া। শুধু আল্লাহর সন্তুষ্টি অর্জনের জন্যই কুরবানির পশু জবাই করা। কুরবানির মধ্যে যদি অন্য কোনো চিন্তা থাকে তবে সে কুরবানি আদায় হবে না। কুরবানি প্রসঙ্গে মহান আল্লাহ ঘোষণা করেন

-لَن يَنَالَ اللَّهَ لُحُومُهَا وَلَا دِمَاؤُهَا وَلَكِن يَنَالُهُ التَّقْوَى مِنكُمْ كَذَلِكَ سَخَّرَهَا لَكُمْ لِتُكَبِّرُوا اللَّهَ عَلَى مَا هَدَاكُمْ وَبَشِّرِ الْمُحْسِنِينَ

এগুলোর গোশত ও রক্ত আল্লাহর কাছে পৌঁছে না, কিন্তু পৌঁছে তাঁর কাছে তোমাদের মনের তাকওয়া। এমনিভাবে তিনি এগুলোকে তোমাদের বশ করে দিয়েছেন, যাতে তোমরা আল্লাহর মহত্ত্ব ঘোষণা কর এ কারণে যে, তিনি তোমাদের পথ প্রদর্শন করেছেন। সুতরাং সৎকর্মশীলদের সুসংবাদ শুনিয়ে দিন।’ (সুরা হজ : আয়াত ৩৭)

এ জন্য কুরবানি করার আগে থামা এবং চিন্তা করা উচিত। কী জন্য এ কুরবানি? কেন কুরবানি করে মুমিন মুসলমান? কুরবানি করার সময় মুমিন মুসলমানের অবস্থা কেমন থাকবে? কুরবানির গোশত, রক্ত কি আল্লাহর কাছে পৌছে?

হ্যাঁ, কুরবানি হচ্ছে মানুষের মনে তাকওয়া। আল্লাহর হুকুম পালনে শুধু আল্লাহর জন্য কুরবানি করা। কুরবানি করার সময় প্রত্যেক মুমিন মুসলমানের হৃদয়ে এ নিয়ত রাখা যে, কুরবানি শুধু আল্লাহর জন্য। মানুষের হৃদয়ে এ আবেগ ও অবস্থা বিরাজ করা জরুরি যে, মুমিন বান্দা বলবে-‘হে আল্লাহ! তোমার সন্তুষ্টির জন্য কুরবানি করছি। তুমি আমাদের কুরবানি কবুল করে নাও।’ কেননা এ কুরবানির পশুর কোনো অংশই তোমার কাছে পৌঁছায় না, পৌঁছে শুধু আমাদের হৃদয়ের খালেছ নিয়ত। কুরবানি করার আগে এভাবে নিজের নিয়তকে পরিশুদ্ধ করা জরুরি।

যদি নিয়ত এমন না হয় তবে আদৌ কুরবানি কবুল হবে না। করবানির হক আদায় হবে না। শুধু লোক দেখানো, আর গোস্ত খাওয়া ছাড়া কুরবানির কোনো ফায়েদাই পাবে না মানুষ।

কেননা এমন অনেক মানুষ রয়েছে, যারা এ কুরবানিকে লোক দেখানোর প্রতিযোগিতা স্বরূপ আদায় করে থাকে। এ যেন এক ফ্যাশন। কে কত বড় পশু কুরবানি করতে পারলো? কার পশুর দাম কত বেশি? কে দেশ সেরা পশু কুরবানি করলো? ইত্যাদি ইত্যাদি..

কারণকুরবানি এমন এক ইবাদত। যে ইবাদতে সব মানুষ অংশগ্রহণ করার চেষ্টা করে। সমাজের একাংশের মানুষের কুরবানি করার অন্যতম কারণগুলো হলো– কুরবানির নগদ লাভ পাওয়া। কুরবানি করার সঙ্গে সঙ্গে মানুষ নগদ লাভ হিসেবে গোশত পেয়ে থাকে। যা অন্য কোনো ইবাদতে পাওয়া যায় না। এ রমক নিয়ত থাকলেও কুরবানি হবে না।- এক শ্রেণির মানুষ নেতৃত্বের খাতিরে কুরবানি করে থাকে। নিজেকে নেতা হিসেবে প্রতষ্ঠিা করতে কুরবানি করে থাকে। এমন চিন্তা থাকলেও কুরবানি হবে না।- নাম যশের জন্য অনেকে কুরবানি করে। একাধিক সংখ্যক বড় পশু কুরবানি করে অন্যদের দৃষ্টি আকষণ করে থাকে। এ নিয়তে কুরবানি করলেও তা আদায় হবে না।

এ সবই কুরবানির নিন্দনীয় কাজ। এ কাজ ও নিয়তের ফলে মানুষের কুরবানি কবুল হয় না। সে কারণেই কুরবানি কী? আর কেন কুরবানি করতে হয়। কুরবানি প্রসঙ্গে মহান আল্লাহ কী নসিহত করেছেন, তা বুঝতে হবে। চিন্তা-ভাবনা করতে হবে। তারপর কুরবানির সিদ্ধান্ত নিতে হবে।

বেশি বেশি এ আয়াতটি স্মরণ করতে হবে-

لَن يَنَالَ اللَّهَ لُحُومُهَا وَلَا دِمَاؤُهَا وَلَكِن يَنَالُهُ التَّقْوَى مِنكُمْ كَذَلِكَ سَخَّرَهَا لَكُمْ لِتُكَبِّرُوا اللَّهَ عَلَى مَا هَدَاكُمْ وَبَشِّرِ الْمُحْسِنِينَ’

কোৱবানী ও অন্নান্য ইবাদতে মুল হলো তাকওয়াঃ
মানুষের মধ্যে দুটি পরস্পর বিরোধী প্রবণতা বা শক্তির পাশাপাশি সাংঘর্ষিক অবস্থানে বিদ্যমান। তা হল, ভাল-মন্দ, সত্য-মিথ্যা, ন্যায়-অন্যায়, কল্যাণ-অকল্যাণ, আলো-অন্ধকার ইত্যাদি। এ পরস্পর বিরোধী দুই প্রবণতার মধ্য থেকে ভাল ও কল্যাণময় প্রবণতা বেছে নিয়ে সেটাকে দৃঢ়ভাবে ধারণ করা এবং এর উপর প্রতিষ্ঠিত থাকার ফলে যত কঠিন পরীক্ষা ও অবস্থারই মুকাবিলার সম্মুখীন হোক না কেন, তা ধৈর্য ও সাহসের সাথে উত্তীর্ণ হওয়া এটাই প্রকৃত তাকওয়া। অর্থাৎ মানবীয় সহজাত সুকুমার বৃত্তি বা আকাঙ্খা যা মানুষকে কুপ্রবৃত্তি তথা মন্দ কথা, খারাপ কাজ ও দুষ্ট চিন্তা থেকে বিরত রাখে, তাকেও তাকওয়া বলা হয়। বর্তমান সমাজ ব্যবস্থার রন্ধ্রে রন্ধ্রে অন্যায়-পাপাচার, অনাচার-অত্যাচার, শিরক, কুফর, বিদায়াত, দুর্নীতি, ঘুষ আর সুদ অক্টোপাসের মত ছড়িয়ে আছে। অন্ধকারের অতল গহবরে ক্রমান্বয়ে তলায়মান ও পতনোন্মুখ এ সমাজের বিষবাষ্প থেকে একজন মুমিনকে আত্মরক্ষা করে সাবধানে জীবনের পথ অতিক্রম করতে হবে। তাকওয়াই হচ্ছে এর একমাত্র পন্থা। আল্লাহর ঘোষণা অনুযায়ী এটিই যাবতীয় কল্যাণের মূল উৎস।

তাকওয়া আরবি শব্দ। এর আভিধানিক অর্থ বিরত থাকা, পরহেজ করা ইত্যাদি।

শরিয়তের পরিভাষায় তাকওয়া হলো, একমাত্র আল্লাহর ভয়ে যাবতীয় অন্যায় কাজ থেকে নিজেকে বিরত রাখা। যে ব্যক্তির মধ্যে তাকওয়া থাকে তাকে মুত্তাকি বলা হয়। সৎ গুণাবলির মধ্যে তাকওয়া হচ্ছে অন্যতম। যার মধ্যে তাকওয়া থাকে সে পার্থিব জীবনের লোভে কোনো খারাপ কাজ করে না এবং পরকালীন জীবনের কল্যাণ ও মঙ্গলের কাজে সব সময় নিজেকে নিয়োজিত রাখে। সাহাবি হজরত আবদুল্লাহ ইবনে আব্বাস (রা.) থেকে বর্ণিত তিনি বলেন, যে ব্যক্তি নিজেকে শিরক, কবিরা গুনাহ ও অশ্লীল কাজকর্ম-কথাবার্তা থেকে বিরত রাখে তাকে মুত্তাকি বলা হয়।

প্রিয় পাঠক, তাকওয়ার অর্থ আরো স্পষ্ট করার জন্য আমাদের মনীষীদের কিছু সংজ্ঞা আপনার সামনে পেশ ‎করছি:‎

কুশাইরী (রহ.) বলেন, “প্রকৃত তাকওয়া হল, শিরক থেকে বেঁচে থাকা, তারপর অন্যায় ও অশ্লীল বিষয় পরিত্যাগ করা, অতঃপর সংশয়পূর্ণ বিষয় থেকে বিরত থাকা, এরপর অনর্থক আজেবাজে বিষয় বর্জন করা।”

তাকওয়ার গুরুত্ব ও তাৎপর্য :
তাকওয়া মানুষ চরিত্রের অন্যতম সম্পদ। ইহলৌকিক ও পারলৌকিক জীবনের মূল ভিত্তি হচ্ছে তাকওয়া। ব্যক্তিগত ও জাতীয় পর্যায়ে সুষ্ঠু ও সুন্দর জীবনযাপনের চালিকাশক্তি হচ্ছে তাকওয়া। মানব জীবনে তাকওয়ার গুরুত্ব ও তাৎপর্য সম্পর্কে পবিত্র কোরআন ও হাদিসে সুস্পষ্ট বর্ণনা রয়েছে।

মহান আল্লাহতায়ালা বলেন,
آل عمران ٣:١٠٢

يَٰٓأَيُّهَا ٱلَّذِينَ ءَامَنُوا۟ ٱتَّقُوا۟ ٱللَّهَ حَقَّ تُقَاتِهِۦ وَلَا تَمُوتُنَّ إِلَّا وَأَنتُم مُّسْلِمُونَ
হে ইমানদারগণ! তোমরা আল্লাহকে যথাযথভাবে ভয় কর (সূরা আলে ইমরান-১০২)
البقرة ٢:١٩٤

ٱلشَّهْرُ ٱلْحَرَامُ بِٱلشَّهْرِ ٱلْحَرَامِ وَٱلْحُرُمَٰتُ قِصَاصٌۚ فَمَنِ ٱعْتَدَىٰ عَلَيْكُمْ فَٱعْتَدُوا۟ عَلَيْهِ بِمِثْلِ مَا ٱعْتَدَىٰ عَلَيْكُمْۚ وَٱتَّقُوا۟ ٱللَّهَ وَٱعْلَمُوٓا۟ أَنَّ ٱللَّهَ مَعَ ٱلْمُتَّقِينَ
এবং তোমরা আল্লাহকে ভয় কর। আর মনে রেখ, নিশ্চয় আল্লাহ মুত্তাকিদের সঙ্গে আছেন। (সূরা বাকারা-১৯৪)।
التوبة ٩:٤

إِلَّا ٱلَّذِينَ عَٰهَدتُّم مِّنَ ٱلْمُشْرِكِينَ ثُمَّ لَمْ يَنقُصُوكُمْ شَيْـًٔا وَلَمْ يُظَٰهِرُوا۟ عَلَيْكُمْ أَحَدًا فَأَتِمُّوٓا۟ إِلَيْهِمْ عَهْدَهُمْ إِلَىٰ مُدَّتِهِمْۚ إِنَّ ٱللَّهَ يُحِبُّ ٱلْمُتَّقِينَ

তাকওয়া আল্লাহর নৈকট্য ও ভালোবাসা লাভ করার উপায়। কোরআন মাজিদে এরশাদ হয়েছে- নিশ্চয়ই আল্লাহ মুত্তাকিদের ভালোবাসেন। (সূরা তাওবা-৪
الحجرات ٤٩:١٣

يَٰٓأَيُّهَا ٱلنَّاسُ إِنَّا خَلَقْنَٰكُم مِّن ذَكَرٍ وَأُنثَىٰ وَجَعَلْنَٰكُمْ شُعُوبًا وَقَبَآئِلَ لِتَعَارَفُوٓا۟ۚ إِنَّ أَكْرَمَكُمْ عِندَ ٱللَّهِ أَتْقَىٰكُمْۚ إِنَّ ٱللَّهَ عَلِيمٌ خَبِيرٌ

মুত্তাকিরা আল্লাহর কাছে অধিক সম্মানিত। এ প্রসঙ্গে মহান আল্লাহপাকের বাণী- তোমাদের মাঝে সে ব্যক্তিই আল্লাহর কাছে অধিক সম্মানিত যে তোমাদের মধ্যে অধিক মুত্তাকি। (সূরা হজুরাত-১৩)

তাকওয়া প্রসঙ্গে রসুল (সা.) থেকে অনেক হাদিস বর্ণিত হয়েছে। সাহাবি হজরত আবু হুরায়রা (রা.) বলেন, রসুল (সা.) কে প্রশ্ন করা হলো, ইয়া রসুলুল্লাহ মানুষের মধ্যে অধিক সম্মানিত কে? তিনি বললেন, তাদের মধ্যে যে অধিক মুত্তাকি বা পরহেজগার। (বুখারি ও মুসলিম)

কোরআনে কারিমের বিভিন্ন আয়াত ও হাদিস বিশ্লেষণ করলে বোঝা যায়, তাকওয়া এমন একটি গুণ যা সমাজ জীবনে মানুষের মধ্যে পারস্পরিক বিশ্বাসযোগ্যতা বৃদ্ধি করে, সমাজে ইতিবাচক মূল্যবোধ সৃষ্টি করে এবং তাকওয়ার অভাবে মানব চরিত্র পাপকর্মে লিপ্ত হয়ে সামাজিক জীবনকে দুর্বিষহ করে তোলে। যার নজির বর্তমান বিশ্বের সর্বত্র বিরাজমান। পরিশেষে বলা যায়, বর্তমান সমস্যাসংকুল ব্যক্তিগত, পারিবারিক, রাষ্ট্রীয় এবং জাতীয় ও আন্তর্জাতিক জীবনের প্রতিটি ক্ষেত্রে তাকওয়ার গুরুত্ব এবং প্রয়োজনীয়তা খুবই বেশি। মানুষের মধ্যে ব্যাপকভাবে যতদিন না তাকওয়া সৃষ্টি হবে, ততদিন মানব জাতির সামগ্রিক কল্যাণ ও মঙ্গল আশা করা যায় না। তাই বলা যায়, তাকওয়া হলো, মানুষের দুনিয়া ও আখেরাত জীবনের মুক্তি ও নাজাতের মূল চাবিকাঠি।

খোদাভীতির একটি দৃষ্টান্তঃ
হযরত ওমর রা. তাঁর খেলাফতকালে লোকজনের খোঁজখবর নেওয়ার জন্য রাতের বেলা মদীনা মুনাওয়ারায় টহল দিতেন। এক রাতে তাহাজ্জুদের পর টহল দিচ্ছিলেন। হঠাৎ লক্ষ করলেন, একটি ঘর থেকে কথাবার্তার শব্দ শোনা যাচ্ছে। সাধারণ অবস্থায় কারো ব্যক্তিগত কথা আড়ি পেতে শোনা জায়েয নয়। কিন্তু দায়িত্বশীল ব্যক্তির জন্য প্রয়োজনের ক্ষেত্রে অনুমতি আছে। তো কথাবার্তার ধরন শুনে তাঁর কৌতূহল হল। তিনি ঘরের দেয়াল ঘেঁষে দাঁড়ালেন এবং শুনতে পেলেন, এক বৃদ্ধা তার মেয়েকে বলছে, ‘বেটি! আজ তো উটের দুধ কম হয়েছে। এত অল্প দুধ বিক্রি করে দিন গুজরান করা কষ্ট হবে। তাই দুধের সাথে একটু পানি মিশিয়ে দাও।’

মেয়ে উত্তরে বলল, ‘মা! আমীরুল মুমিনীন তো দুধের সাথে পানি মেশাতে নিষেধ করেছেন?’ বৃদ্ধা বললেন, ‘আমীরুল মুমিনীন কি আমাদের দেখছেন? তিনি হয়তো নিজ ঘরে ঘুমিয়ে আছেন। তুমি নিশ্চিন্তে পানি মেশাতে পার।’

এবার মেয়ে বলল, ‘মা, আমীরুল মুমিনীন এখানে নেই এবং তার কোনো লোকও নেই। কিন্তু আল্লাহ তাআলা তো আছেন! তিনি তো দেখছেন! তাঁর কাছে আমরা কী জবাব দেব?’

ওমর রা. দেয়ালের ওপাশ থেকে সব কথা শুনতে পাচ্ছিলেন। এতটুকু শুনেই তিনি চলে এলেন এবং পরদিন লোক পাঠিয়ে সে ঘরের খোঁজখবর নিলেন। তারপর বৃদ্ধার কাছে পয়গাম পাঠালেন যে, ‘আপনি সম্মত হলে আপনার মেয়ের সাথে আমার ছেলের বিয়ে দিতে চাই।’

এভাবে তাকওয়ার বদৌলতে মেয়েটি আমীরুল মুমিনীনের পুত্রবধু হওয়ার সৌভাগ্য অর্জন করল। এই বরকতময় ঘরের তৃতীয় পুরুষে জন্মগ্রহণ করলেন খলীফা ওমর বিন আবদুল আযীয রাহ., যাকে পঞ্চম খলীফায়ে রাশেদ বলা হয়।

তো মানুষের অন্তরে সর্বক্ষণ এই ধ্যান জাগরুক থাকা যে, ‘আল্লাহ তাআলা আমাকে দেখছেন’-এর নামই তাকওয়া।

হযরত আলী (রা.) খুব সুন্দর ও সহজভাবে তাকওয়ার সংজ্ঞা দিয়েছেন, যা বোঝা এবং আমল করা খুব সহজ। তাঁর মতে তাকওয়া হল চারটি বিষয়; এক : আল্লাহর ভয়, দুই : কুরআনে যা নাযিল হয়েছে তদানুযায়ী আমল, তিন : অল্পে তুষ্টি, চার : শেষ দিবসের জন্য সদা প্রস্তুতি।

হযরত উমর (রা.) কে একবার হযরত কা’ব (রা.) তাকওয়া সম্পর্কে জিজ্ঞেস করলেন“আপনি কি কখনও কণ্টকময় পথে হেঁটেছেন?” হযরত উমর (রা.) হ্যাঁ বললে তিনি আবার জিজ্ঞেস করলেন, “আপনি সেই পথ কিভাবে পার হন?” হযরত উমর (রা.) উত্তরে বললেন যে তিনি খুব সন্তর্পনে নিজের কাপড় গুটিয়ে সেই রাস্তা পার হন যেন কোনভাবেই কাঁটার আঘাতে কাপড় ছিঁড়ে না যায় অথবা শরীরে না বিঁধে। হযরত কা’ব উত্তরে বললেন যে, এটাই হল তাকওয়া। দুনিয়ার জীবনে নিজেকে সমস্ত গুনাহ থেকে এভাবে বেঁচে চলাই হল তাকওয়া।

হযরত হাসান বসরী (রহ.) বলেছেন, “তাকওয়া হল দ্বীনের ভিত্তি, এটি ধ্বংস হয় লোভ এবং আকাঙ্খার মাধ্যমে।”

হযরত মাওলান গুলাম হাবীব (রহঃ) তাকওয়ার
আবদুল্লাহ্‌ বিন মাসঊদ (রা.) বলেন, “তাকওয়া হচ্ছে: আল্লাহ্‌র আনুগত্য করা- নাফরমানি না করা, তাঁকে স্মরণ করা- ভুলে না যাওয়া, তাঁর কৃতজ্ঞতা করা- কুফরী না করা।”

ওমর বিন আবদুল আযীয বলেন, “দিনে ছিয়াম আদায় এবং রাতে নফল ছালাত আদায়ই আল্লাহ্‌র ভয় নয়; বরং প্রকৃত আল্লাহ্‌র ভয় হচ্ছে, আল্লাহ্‌ যা হারাম করেছেন তা পরিত্যাগ করা, তিনি যা ফরয করেছেন তা বাস্তবায়ন করা। কেউ যদি এর অতিরিক্ত কিছু করতে পারে তবে সোনায় সোহাগা।” প্রকাশ্যে পাপের কাজ পরিত্যাগ করার নাম তাকওয়া নয়; বরং গোপন-প্রকাশ্য সবধরনের পাপের কাজ পরিত্যাগ করার নামই আসল তাকওয়া। যেমন রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেন, “তুমি যেখানেই থাকনা কেন আল্লাহকে ভয় কর।” [তিরমিযী]

ৱাসুল (সা.)তাকওয়ার পরিচয়ে বলেন,“যে বিষয় মানুষকে সবচেয়ে বেশী জান্নাতে নিয়ে যায় তা হল, তাকওয়া এবং উত্তম ব্যবহার; আর যে বিষয় মানুষকে সবচেয়ে বেশী জাহান্নামে নিয়ে যায় তা হল, জিহ্বা এবং লজ্জাস্থান।”(তিরমিযী)

তাফসির ইবনে কাছিরে উল্লেখ আছে যে,
:তাকওয়ার তিনটি স্তর রয়েছে। সর্বনিম্ন স্তর হলো কুফর ও শিরক থেকে বেচে থাকা। এ অর্থে প্রত্যেক মুসলমানকে আল্লাহভীরু বলা যায়। যদিও সে গোনাহের কাজে লিপ্ত থাকে। এ অর্থ বুঝানোর জন্যই কুরআনে করিমে অনেক জায়গায় মুত্তাকী ‘আল্লাহভীরু’ ও তাকওয়া ‘খোদাভীরুতা’ শব্দ ব্যবহৃত হয়েছে।

দ্বিতীয় স্তর যা আসলে কাম্য-তা হলো এমন সব বিষয় থেকে বেচে থাকা, যা আল্লাহ তা’য়ালা ও তার রাসুলের পছন্দনীয় নয়। কোরআন ও হাদিসে যে তাকওয়ার যে সব ফজিলত ও কল্যাণ প্রতিশ্রুত হয়েছে, তা এ স্তরের তাকওয়ার উপর ভিত্তি করেই হয়েছে।

তৃতীয় স্তরটি তাকওয়ার সর্বোচ্চ স্তর। আম্বিয়া আলাইহিমুছ ছালাম ও তাদের বিশেষ উত্তরাধিকারী ওলীগণ এ স্তরের তাকওয়া অর্জন করে থাকেন। অর্থাৎ অন্তরকে আল্লাহ ব্যতীত সব কিছু থেকে বাঁচিয়ে রাখা এবং আল্লাহর স্মরণ ও তার সন্তুষ্টি কামনার দ্বারা পরিপূর্ণ ও সমৃদ্ধ রাখা। মহান আল্লাহ বলেছেন-আল্লাহকে ভয় করো যেমনভাবে করা উচিত অর্থাৎ তাকওয়ার ঐ স্তর অর্জন কর, যা তাকওয়ার হক।

সব খানে তাসহিহে নিয়্যাতেৱ গুৱত্বঃ
কর্মের মাধ্যমে অভীষ্ট লক্ষ্য ও উদ্দেশ্যের পার্থক্য নিরূপণ ও স্বতন্ত্র বৈশিষ্ট্য প্রদান। অর্থাৎ, কর্মের উদ্দেশ্য কি লা-শরিক এক আল্লাহর সন্তুষ্টি, নাকি সরাসরি আল্লাহ ভিন্ন অপর কারো সন্তুষ্টি, অথবা আল্লাহর সাথে সাথে ভিন্ন কেউ?—এভাবে পার্থক্য নিরূপণ। উদাহরণত: সালাত আদায়। নিয়তের মাধ্যমে সহজে আমরা পার্থক্য নির্ণয় করতে সক্ষম হই যে, বান্দা তা কি একমাত্র আল্লাহর উদ্দেশ্যে, তার নির্দেশ পালনার্থে, তাকে ভালোবেসে, করুণা প্রাপ্তির আশায়, তার শাস্তির ভয়ে ভীত হয়ে সালাত আদায় করেছে, না তার আদায়ের পিছনে কাজ করেছে লোক-দেখানো, বা যশ-খ্যাতি প্রাপ্তির মত হীন উদ্দেশ্য।

‘যে ব্যক্তি দুনিয়ার নিয়ত রাখবে। আমি তাকে ইহজগতে যতটুকু ইচ্ছা প্রদান করবো, অতঃপর তার জন্য দোযখ নির্ধারণ করবো, সে এতে দুর্দশাগ্রস্ত বিতাড়িত অবস্থায় প্রবেশ করবে। পক্ষান্তরে যে ব্যক্তি আখিরাতের নিয়ত রাখবে এবং এর জন্য যেমন চেষ্টার প্রয়োজন তেমন চেষ্টাও করবে। যদি সে মুমিন হয় এরূপ লোকদের চেষ্টা কবুল হবে।’ (বনী ইসরাইল ১৮-১৯)

বিশুদ্ধ নিয়ত সম্পর্কে হাদীস
«1» حَدَّثَنَا الْحُمَيْدِيُّ عَبْدُ اللَّهِ بْنُ الزُّبَيْرِ قَالَ: حَدَّثَنَا سُفْيَانُ قَالَ: حَدَّثَنَا يَحْيَى بْنُ سَعِيدٍ الأَنْصَارِيُّ قَالَ: أَخْبَرَنِي مُحَمَّدُ بْنُ إِبْرَاهِيمَ التَّيْمِيُّ أَنَّهُ سَمِعَ عَلْقَمَةَ بْنَ وَقَّاصٍ اللَّيْثِيَّ يَقُولُ: سَمِعْتُ عُمَرَ بْنَ الْخَطَّابِ رَضِيَ اللَّهُ عَنْهُ عَلَى الْمِنْبَرِ قَالَ: سَمِعْتُ رَسُولَ اللَّهِ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ يَقُولُ: ((إِنَّمَا الأَعْمَالُ بِالنِّيَّاتِ، وَإِنَّمَا لِكُلِّ امْرِئٍ مَا نَوَى، فَمَنْ كَانَتْ هِجْرَتُهُ إِلَى دُنْيَا يُصِيبُهَا أَوْ إِلَى امْرَأَةٍ يَنْكِحُهَا فَهِجْرَتُهُ إِلَى مَا هَاجَرَ إِلَيْهِ)).
[أطرافه 54، 2529، 3898، 5070، 6689، 6953، تحفة 10612- 2/ 1].

হযরত উমার ইবনে খাত্তাব (রা.) হতে বর্ণিত, তিনি বলেন, রাসূলুল্লাহ (সা.) ইরশাদ করেছেন, ‘যাবতীয় কাজের ফলাফল নিয়তের উপরেই নির্ভর করে। আর প্রতিটি লোক (পরকালে) তাই পাবে যা সে নিয়ত করেছে। সুতরাং যে ব্যক্তি আল্লাহ ও রাসূলের উদ্দেশ্যে হিজরত করে, তার হিজরত আল্লাহ ও রাসূলের উদ্দেশ্যেই হবে। আর যে ব্যক্তি দুনিয়ার কোনও স্বার্থ উদ্ধারের নিয়তে হিজরত করে, মূলত তার হিজরত সে উদ্দেশ্যেই হবে।’ (বুখারী, মুসলিম)

বিধান ও ফায়দা:
অর্থ, মর্ম ও ব্যাপ্তির বিচারে হাদিসটি খুবই গুরুত্বপূর্ণ, মহিমান্বিত ও ব্যাপক। নি:সন্দেহে তা দ্বীনের অন্যতম মৌলিক ভিত্তি। এ কারণে অনেক সালাফে সালিহীন (উত্তম পূর্ব-সুরী) এর গুরুত্ব, মাহাত্ম্য, ও তাৎপর্য তুলে ধরেছেন। আল্লামা ইবনে রজব রহ. বলেন: ইমাম বোখারি র. তাঁর কিতাব সহিহ বোখারির প্রারম্ভে ভূমিকা স্বরূপ হাদিসটির অবতারণা করে এ বিষয়টির প্রতি ইঙ্গিত করেছেন যে, আল্লাহর সন্তুষ্টিই একমাত্র উদ্দেশ্য নয়—এমন সকল আমল বাতিল হিসেবে পরিত্যাজ্য, এ ধরনের আমল দুনিয়া ও আখেরাতে চূড়ান্তভাবে প্রতিফলশূন্য। ইমাম শাফেয়ি রহ. বলেছেন: এ হাদিস দ্বীনের যাবতীয় উলুমের এক তৃতীয়াংশ, এবং ফিকাহ শাস্ত্রের সত্তুরটি অনুচ্ছেদে (প্রমাণ, প্রতিপাদ্য বা অন্য যে কোনভাবে) উল্লেখিত। ইমাম আহমদ রহ. বলেছেন :—
أصول الإسلام على ثلاثة أحاديث:

ইসলামের ভিত্তি তিনটি হাদিসের উপর স্থাপিত।
এক: উমর র. কর্তৃক বর্ণিত হাদিস: সকল আমলের ফলাফল নিয়তের উপর নির্ভরশীল।

দুই: আয়েশা কর্তৃক বর্ণিত হাদিস: যে ব্যক্তি আমাদের এই দ্বীনে অন্তর্ভুক্ত নয়—এমন নতুন কিছু আবিষ্কার বা সংযোজন করবে, তা গ্রহণযোগ্য নয়।

তিন: নোমান ইবনে বশীর কর্তৃক বর্ণিত হাদিস: হালাল বিষয়ও সুস্পষ্ট, হারাম বিষয়ও সুস্পষ্ট।

মাসায়েল ও উপকারিতা:
এক: ইসলামি শরিয়তে নিয়তের অবস্থান অতি উঁচু স্থানে, তা খুবই তাৎপর্যপূর্ণ। আমল গ্রহণযোগ্য হয় না বিশুদ্ধ নিয়ত ব্যতীত। আমলের শুদ্ধি ও গ্রহণযোগ্যতার অন্যতম শর্ত হচ্ছে নিয়ত। এ কারণে আল্লাহ তাআলা সকল এবাদতে নিয়তকে খাঁটি করার নির্দেশ দিয়েছেন। যেমন—আল্লাহ তাআলা বলেছেন: “তুমি আল্লাহর এবাদত কর তাঁরই জন্য এবাদতকে বিশুদ্ধ করে।” [সূরা যুমার: ২] তিনি আরো বলেছেন: “তাদের শুধু এ নির্দেশই দেয়া হয়েছে যে, তারা যেন একনিষ্ঠভাবে খাঁটি নিয়তে আল্লাহরই এবাদত করে।” [সূরা বায়্যিনাহ: ৫].

হাদিসে কুদসি প্রমাণ করে বহু আমলধারী লোক সারা জীবন আমল করা সত্বেও জাহান্নামের আগুনে নিক্ষেপিত হবে। যার কারণ হচ্ছে শুধুমাত্র নিয়তের বিশুদ্ধতার অভাব।
নিয়ত বলতে আমরা কী বুঝি?নিয়ত হচ্ছে মনের ইচ্ছা বা সংকল্প। যা মানুষের মনের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট গুরুত্বপূর্ণ একটি ইবাদত। আর বিশুদ্ধ নিয়ত হচ্ছে কোনো কাজ করার ইচ্ছা পোষণ করে সফলতা লাভ করা।

আল্লাহ তায়ালা স্বচ্ছলতা দিয়েছেন ও সর্বপ্রকার সম্পদ দান করেছেন,। তাকে আল্লাহর নেয়ামতের কথা জানানো হবে, সে তা স্বীকার করবে।আল্লাহ বলবেন, তুমি, এর প্রতিদানে কী আমল করেছ?সে বলবে, যেখানে খরচ করা আপনি পছন্দ করেন, এমন কোনো খাত বাকি নেই, যেখানে আমি খরচ করিনি। আল্লাহ বলবেন, তুমি মিথ্যা বলেছ; বরং তুমি তা করেছ যেন লোকে তোমাকে দানবীর বলে। অতএব তোমাকে দানশীল বলা হয়েছে।অতঃপর তার ব্যাপারে জাহান্নামে নিক্ষেপের নির্দেশ দেয়া হবে। তাকে তার চেহারার ওপর ভর করে টেনে-হিঁচড়ে জাহান্নামে নিক্ষেপ করা হবে।’ (মুসলিম ও নাসাঈ)।

উল্লেখিত হাদিসের আলোকে এ কথা সুস্পষ্ট যে-যে কানো ভালো কাজের নিয়ত করার সঙ্গে সঙ্গেই সাওয়াব শুরু হয়ে যায়। আবার কাজ ভালো কিন্তু নিয়ত বিশুদ্ধ নয়, তবে সে কাজেও সফলতা আসবে না বরং তাকে কঠিন জাহান্নামে নিক্ষেপ হতে হবে।

সুতরাং মানুষের উচিত প্রথমে নিয়ত ঠিক করা। অতঃপর আমল করা। যদি নিয়ত ঠিক হয় তবে আমলও পাওয়া যাবে পরিপূর্ণ। আর যদি নিয়ত ঠিক না হয় তবে ভালো কাজেও সাওয়াব পাওয়া যাবে না বরং তার জন্য জাহান্নামের আজাব সুনিশ্চিত।

কাজেই বিশুদ্ধ নিয়ত ছাড়া কোন আমল কিছুতেই সঠিক হতে পারে না। যার সালাতের লক্ষ্য গায়রুল্লাহর সন্তুষ্টি, তার নামাজ গ্রহণযোগ্য নয় কোনভাবে। অনুরূপভাবে, যার জাকাত দানের পেছনে লোক দেখানোর মত কপটাচার-কুমতলব লুকিয়ে থাকে তার সেই জাকাত আদৌ কবুল করা হবে না। এমনিভাবে কোন আমল সহিহ নিয়ত ছাড়া গৃহীত হয় না।

সালাফে সালিহীন রহ. নিয়ত বিষয়টির প্রতি অতি গুরুত্ব দিয়েছেন। তারা তার প্রতি রাখতেন সর্বোচ্চ সতর্কতা ও সজাগ দৃষ্টি। গুরুত্ব ও সতর্কতা প্রমাণ করে তাদের এমন কিছু উক্তি নিম্নে পেশ করা হচ্ছে :—উমর রা. বলেছেন—
لا عمل لمن لا نية له، ولا أجر لمن لا حسبة له.

যার নিয়ত নেই, তার কোন আমল নেই।
অর্থাৎ যার কোন সওয়াবের উদ্দেশ্য নেই, তার কোন পুরস্কার নেই। আব্দুল্লাহ ইবনে মাসঊদ রা. থেকে বর্ণিত: কর্ম ব্যতীত বাকোয়াজিতে কোন ফল নেই, আর নিয়ত ব্যতীত কর্ম অসার। কর্ম, কথা ও নিয়ত কোন কাজে আসবে না, যতক্ষণ না তা রাসূলের সুন্নতের অনুসারে করা হবে। দাউদ তাঈ রহ. বলেন: আমি দেখেছি, কল্যাণের সুসন্বিবেশ হয় পরিশুদ্ধ নিয়তের মাধ্যমে। ইবনে মোবারক রহ. বলেন: নিয়ত অনেক ক্ষুদ্র আমলকে মহৎ আমলে রূপান্তরিত করে। পক্ষান্তরে, অনেক বৃহৎ আমলকেও তা ক্ষুদ্র করে দেয়।

উক্ত হাদিস থেকে এ বিষয়টি সাব্যস্ত হয় যে, মানুষ তার নিয়ত অনুসারেই কৃতকর্মের ফলাফল লাভ করে। এমনকি, সে নিজের ব্যবহারিক জীবনে পানাহার, উপবেশন, নিদ্রা—প্রভৃতির ন্যায় যে কর্মগুলো স্বীয় অভ্যাস-বশে সম্পাদন করে, সে সব কর্ম ও সদিচ্ছাও সৎ নিয়তের বদৌলতে পুণ্যময় কর্মে পরিণত হতে পারে। পারে পুরস্কার বয়ে আনতে এরই মধ্য দিয়ে। সুতরাং কেউ হালাল খাবার খাওয়ার সময় উদর ও প্রবৃত্তির চাহিদা পূরণের পাশাপাশি এবাদতের শক্তি-ক্ষমতা লাভের এরাদাও যদি করে নেয়, তাহলে এর জন্য সে অবশ্যই পুরস্কৃত হবে। এমনিভাবে মনোমুগ্ধকর ও মনোরঞ্জক যে কোন সু-স্বাদু বৈধ বিষয়ও নেক নিয়তের সঙ্গে উপভোগ করলে তা বন্দেগিতে রূপান্তরিত হয়।

যেমন, আবু যর কর্তৃক বর্ণিত হাদিসে রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম সদকা বিষয়ক আলাপকালে বলেছেন: তোমাদের প্রত্যেকের লজ্জাস্থানে (স্ত্রী সম্ভোগে) সদকার সওয়াব রয়েছে। তখন উপস্থিত সাহাবিগণ বললেন : হে আল্লাহর রাসূল ! আমাদের কেউ যদি স্বীয় স্ত্রীর নিকট যৌন-চাহিদা পূরণের জন্য গমন করে তাহলে এতেও কি তার জন্য পুরস্কার আছে ? তিনি উত্তর বললেন : হাঁ, তোমরা কী মনে কর, সে যদি কোন হারাম পাত্রে তার যৌন-চাহিদা পূরণ করে তবে এতে তার পাপ হবে ? তারা জবাব দিলেন, হাঁ ! তখন তিনি বললেন, ঠিক তদ্রুপ সে যদি কোন হালাল পাত্রে নিজের যৌন-চাহিদা মেটায় তাহলে তার জন্য তাতে পুরস্কার থাকবে।

সাদ ইবনে আবু ওয়াক্কাস রা. হতে বর্ণিত যে, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তাকে বলেছেন: নি:সন্দেহে আল্লাহর সন্তুষ্টি লাভের লক্ষ্যে তোমার যে কোন ব্যয়ের পরিবর্তে তুমি পুরস্কার প্রাপ্ত হবে। এমনকি, পানাহার হিসাবে যা-ই তুমি নিজের স্ত্রীর মুখে দেবে তার জন্যও তুমি পুরস্কৃত হবে।

রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন: ‘সমস্ত আমলই নিয়তের উপর নির্ভরশীল এবং নিয়ত অনুযায়ীই প্রত্যেকের কর্মফল বিবেচিত হয়।’ এই হাদিসটি প্রমাণ করে, বিশুদ্ধ ঈমানের জন্য শুধু মৌখিক স্বীকৃতি যথেষ্ট নয়, বরং হৃদয়ের দৃঢ় বিশ্বাসও একান্ত আবশ্যক। কেননা, ঈমান মৌখিক স্বীকৃতি, আত্মার বিশ্বাস এবং অঙ্গ-প্রত্যঙ্গের আমলের সমন্বয়ে গঠিত, যা আল্লাহর আনুগত্য দ্বারা বৃদ্ধি এবং তার নাফরমানি দ্বারা হ্রাস পায়।’

উক্ত হাদিস থেকে এই ভয়ানক হুমকিও প্রমাণিত হয় যে, যে ব্যক্তি এমন কোন আমল করবে যার লক্ষ্য আল্লাহর সন্তুষ্টি নয়, তবে তার কৃত-কর্ম না পুরস্কার যোগ্য, না গ্রহণযোগ্য। যেমন : কেউ লোক প্রদর্শনের নিয়তে জিহাদে যোগদান করল অথবা কেউ সুনাম-সুখ্যাতি কুড়ানোর মানসে ধন-দৌলত ব্যয় করল, অথবা ‘আলেম’ উপাধি লাভের লোভে জ্ঞানার্জন করল, অথবা ‘তার কোরআন পাঠ কতই না সুন্দর’—এই প্রশংসা পাওয়ার উদ্দেশ্যে তা শিক্ষা করল। অনুরূপভাবে তাদের ন্যায়, যাদের কর্ম-কাণ্ডের নেপথ্যে কুমতলব কিংবা কু-নিয়ত কার্যকর থাকবে, তাদের সকলের পুনরুত্থান ঘটবে নিজ নিজ নিয়ত অনুযায়ীই। আল্লাহ তাআলা বলেন: “যারা পার্থিব জীবন ও তার চাকচিক্য কামনা করে, আমি তাদের দুনিয়াতে আমলের প্রতিফল ভোগ করিয়ে দেই এবং তাতে তাদের প্রতি কিছুমাত্র কমতি করা হয় না। এরাই বরবাদগ্রস্ত এবং যা কিছু উপার্জন করেছিল সব বিনষ্ট হয়ে গিয়েছে।” [১৬ সূরা হুদ ১৫-১৬].

যে সকল মুসল্লিদের সালাতের নেপথ্যে লুক্কায়িত থাকে লোক-দেখানো ও যশ-খ্যাতির মনোভাব, তাদের সম্বন্ধে আল্লাহ তাআলা বলেন: “অতএব, দুর্ভাগ্য সে সব সালাত আদায়কারীর, যারা তাদের সালাত সম্বন্ধে বে-খবর। যারা তা লোক-দেখানোর জন্য করে। এবং নিত্য ব্যবহার্য বস্তু অন্যকে দেয় না।” [সূরা আল-মা‘ঊন: ৪-৭]

হযরত আবু হুরায়রা (রা.) হতে বর্ণিত, তিনি বলেন রাসূলুল্লাহ (সা.) বলেছেন, ‘কিয়ামতের দিন সর্বপ্রথম এমন এক ব্যক্তির বিচার করা হবে, যিনি শহীদ হয়েছেন। তাকে আল্লাহর দরবারে হাজির করে তার প্রতি আল্লাহ প্রদত্ত যাবতীয় নিয়ামতের কথা স্মরণ করিয়ে দেয়া হবে। সে ওইসব নিয়ামত প্রাপ্তি ও ভোগের কথা স্বীকার করবে। অতঃপর তাকে জিজ্ঞেস করা হবে তুমি আমার এসব নিয়ামত পেয়ে কি করেছো? সে উত্তরে বলবে আমি আপনার পথে লড়াই করতে করতে শেষ পর্যন্ত শহীদ হয়ে গেছি। আল্লাহ বলবেন তুমি মিথ্যা বলছো। তুমি বীর খ্যাতি অর্জনের জন্য লড়াই করেছ এবং সে খ্যাতি তুমি দুনিয়াতেই পেয়ে গেছো। অতঃপর তাকে উপুড় করে পা ধরে টেনে হেঁচড়ে দোযখে নিক্ষেপ করার হুকুম দেয়া হবে এবং সে দোযখে নিক্ষিপ্ত হবে। এভাবে হাজির করা হবে এমন ব্যক্তিকে যাকে আল্লাহ স্বচ্ছলতা ও নানা রকম ধন-সম্পদ দান করেছেন। তাকে তার প্রতি প্রদত্ত নিয়ামতের কথা স্মরণ করিয়ে দেয়া হবে। সে এসব নিয়ামত প্রাপ্তি ও ভোগের কথা স্বীকার করবে। তাকে জিজ্ঞেস করা হবে, এসব পেয়ে তুমি কি করেছো? সে বলবে আমি আপনার পছন্দনীয় সব খাতেই আমার সম্পদ খরচ করেছি। আল্লাহ বলবেন তুমি মিথ্যে বলছো। তুমি দাতারূপে খ্যাত হবার জন্যেই দান করেছো। সে খ্যাতি তুমি অর্জনও করেছো। তারপর ফায়সালা দেয়া হবে এবং উপুড় করে পা ধরে টেনে জাহান্নামে নিক্ষেপ করা হবে।’ (মুসলিম)

‘মুসলিম শরিফে হজরত আবু হুরায়রা (রা.) থেকে বর্ণিত রয়েছে, হজরত রাসূল (সা.) ইরশাদ করেন, যে আল্লাহ পাক তোমাদের কারও চেহারা বা ধন-দৌলতের দিকে তাকান না; বরং তিনি দেখেন তোমাদের হৃদয় ও আমলকে।

বিশুদ্ধ নিয়তের বিস্ময়কর ঘটনা:
হাদীস শরীফে বর্ণিত আছে,মোমেনের নিয়ত;তার আমলের চেয়েও শ্রেষ্ঠ। অন্য এক হাদীসে
হযরত উমর র. বলেন : আমি রাসূলুল্লাহ সাল্লাহু আলাইহি অসাল্লামকে বলতে শুনেছি তিনি
বলেন : নিশ্চয় স্মরণ রেখ! আল্লাহ পাকের নিকট কাজের ফলাফল মানুষের নিয়ত অনুসারে হয়।
প্রত্যেক মানুষ তার কজের ফলাফল আল্লাহ পাকের নিকট তেমনই পাবে যেমন সে নিয়ত করবে।
এজন্য নিয়তের গুরুত্ব অপরিসীম। আল্লামা ইবনে কাসীর রহ. বোখারী শরীফে সংকলিত একটি
ঘটনা উল্লেখ করেছেন। প্রিয় নবী স. এরশাদ করেছেন : বণী ইসরাঈলে এক ব্যক্তি ছিল যে অন্য
এক ব্যক্তি থেকে এক হাজার স্বর্ণমুদ্রা ঋণ চেয়েছিল। সে ব্যক্তি বললো : তুমি যে স্বর্ণমুদ্রা ঋণ গ্রহণ করবে তার জন্য একজন সাক্ষী হাযির কর। লোকটি বলল : আমার জন্য সাক্ষী হিসেবে আল্লাহ পাকই যথেষ্ট। লোকটি বলল : তুমি যে টাকা ফেরত দেবে এজন্য জামিন দরকার,সে বললো আমার জামিন স্বয়ং আল্লাহ পাক। একথার উপর সন্তুষ্ট হয়ে এক হাজার স্বর্ণমুদ্রা একটি নির্দিষ্ট মেয়াদে ঋণ দিল। এর পর সে সামুদ্রিক পথে বিদেশে সফরে চলে গেল। কাজ শেষ
হলে সে দেশে ফেরার উদ্দেশ্যে সমুদ্র তীরে হাযির হল। এবং জাহাজের অপেক্ষা করতে লাগলো,কিন্তু কোন জাহাজের ব্যবস্থা হলনা। এদিকে ঋণ আদায়ের সময় এসেগেল,সে অত্যন্ত ব্যাকুল চিত্তে সময় কাটায় কিন্তু জাহাজের কোন ব্যবস্থাই হলোনা | তখন ঔ ব্যক্তি একটি কাঠের খন্ড হাতে নিয়ে তার মাঝখানে ফাঁকা করলো এবং এক হাজার স্বর্ণমুদ্রা এবং একটি চিঠি তার মধ্যে রেখে দিল। এর পর কাঠের খন্ডটির মুখ বন্ধ করে সমুদ্রে নিক্ষেপ করলো এবং বলল : হে আল্লাহ! তুমি তো জানো আমি শুধু তোমাকে সাক্ষী করে এবং তোমার জামানাতে
এক হাজার স্বর্ণমুদ্রা ঋণ নিয়েছিলাম। কিন্তু আমি সর্বপরি চেষ্টা সত্ত্বেও সমুদ্র পার হতে পারছিনা তাই বাধ্য হয়ে তোমার প্রতি ভরসা করে এ কাঠের খন্ডে এক হাজার স্বর্ণমুদ্রা রেখে সমুদ্রে ফেলে দিচ্ছি। তুমি তাকে তা পৌঁছে দাও। কাঠের কন্ডটি মুহূর্তে পানিতে ডুবে গেল। এর পরও সে অনেক চেষ্টা করলো সমুদ্র পার হতে,কিন্তু সকল চেষ্টা ব্যর্থ হলো।এদিকে ঋণ দাতা সমুদ্র তীরে এসে অপেক্ষা করছে যে ঐ ব্যক্তি আজকের তারিখে তার ঋণ শোধ করবে। কিন্তু পুরোদিন অপেক্ষা করার পরও যখন দেখলো কোন জাহাজ আসলো না তখন সে বিফল মনোরথ হয়ে ফিরে আসার ইচ্ছা করলো।এমন সময় সমুদ্র তীরে একটি কাঠের খন্ড দেখতে পেলে তা সে তুলে নেয়,এ ইচ্ছা করে যে হয়তো জ্বালানির কাজে আসবে। বাড়ীতে আসার পর কাঠের কন্ডটি খুলে দেখে তাতে রয়েছে একটি চিঠি ও এক হাজার স্বর্ণমুদ্রা। কিছু দিন পর সে ব্যক্তি দেশে ফিরে ঋণ দাতার নিকট তার বিলম্বে হাযির হওয়ার কারণ প্রকাশ করলো। সে বললো : তুমি যে স্বর্ণমুদ্রা আমার নামে পাঠিয়ে ছিলে আল্লাহ পাক তা আমাকে পৌঁছে দিয়েছেন। এখন তুমি খুশিমনে বাড়ী যেতে পার।
বস্তুত : মানুষ যখন আল্লাহ পাকের প্রতি বিশ্বাস এবং ভরসা করে তখন আল্লাহ পাক-ই তাকে
সাহায্য করেন। মানুষের নিয়ত যখন সঠিক থাকে আল্লাহ পাক তখন তার সহায় হন।

হাবিল (আঃ) এৱ তাকওয়াঃ

وَاتْلُ عَلَيْهِمْ نَبَأَ ابْنَيْ آدَمَ بِالْحَقِّ إِذْ قَرَّبَا قُرْبَاناً فَتُقُبِّلَ مِنْ أَحَدِهِمَا وَلَمْ يُتَقَبَّلْ مِنْ الآخَرِ قَالَ لأَقْتُلَنَّكَ قَالَ إِنَّمَا يَتَقَبَّلُ اللهُ مِنْ الْمُتَّقِينَ)
অর্থাৎ, আদমের দুই পুত্রের (হাবিল ও কাবিলের) বৃত্তান্ত তুমি তাদেরকে যথাযথভাবে শুনিয়ে দাও, যখন তারা উভয়ে কুরবানী করেছিল, তখন একজনের কুরবানী কবুল হল এবং অন্য জনের কুরবানী কবুল হল না। তাদের একজন বলল, আমি তোমাকে অবশ্যই হত্যা করব। অপরজন বলল, আল্লাহ তো সংযমীদের কুরবানীই কবুল করে থাকেন।(সূরা মাইদাহ ২৭ আয়াত)

ইব্ৰাহিম আঃ এৱ তাকওয়াঃ
ইবরাহীম (আলাইহিস সালাম)-এর কুরবানীর আদর্শ হওয়ার ব্যাপারে মহান আল্লাহ বলেন,
(فَلَمَّا بَلَغَ مَعَهُ السَّعْيَ قَالَ يَا بُنَيَّ إِنِّي أَرَى فِي الْمَنَامِ أَنِّي أَذْبَحُكَ فَانظُرْ مَاذَا تَرَى قَالَ يَا أَبَتِ افْعَلْ مَا تُؤْمَرُ سَتَجِدُنِي إِن شَاء اللهُ مِنَ الصَّابِرِينَ- فَلَمَّا أَسْلَمَا وَتَلَّهُ لِلْجَبِينِ- وَنَادَيْنَاهُ أَنْ يَا إِبْرَاهِيمُ- قَدْ صَدَّقْتَ الرُّؤْيَا إِنَّا كَذَلِكَ نَجْزِي الْمُحْسِنِينَ- إِنَّ هَذَا لَهُوَ الْبَلَاء الْمُبِينُ- وَفَدَيْنَاهُ بِذِبْحٍ عَظِيمٍ – وَتَرَكْنَا عَلَيْهِ فِي الْآخِرِينَ)

অর্থাৎ, অতঃপর সে (ইসমাঈল) যখন পিতা (ইবরাহীমের)র সাথে চলা-ফিরার (কাজ করার) বয়সে উপনীত হল, তখন ইবরাহীম তাকে বলল, ‘হে বেটা! আমি স্বপ্নে দেখি যে, তোমাকে যবেহ করছি; এখন তোমার অভিমত কি দেখ।’ সে বলল, ‘আববা! আপনাকে যা আদেশ করা হয়েছে, আপনি তা পালন করুন। ইনশাআল্লাহ, আপনি আমাকে ধৈর্যশীলরূপে পাবেন।’ অনন্তর পিতা-পুত্র উভয়েই যখন আনুগত্য প্রকাশ করল এবং ইবরাহীম তাকে যবেহ করার জন্য অধোমুখে শায়িত করল, তখন আমি ডেকে বললাম, ‘হে ইবরাহীম! তুমি তো স্বপ্নকে বাস্তবে পরিণত করে দেখালে। আমি এভাবেই সৎকর্মীদেরকে প্রতিদান দিয়ে থাকি। নিশ্চয় এটা এক সুস্পষ্ট পরীক্ষা। আর আমি তার পরিবর্তে যবেহ করার জন্য এক মহান জন্তু দিয়ে তাকে মুক্ত করে নিলাম। আর তার জন্য এ বিষয়টি পরবর্তীদের জন্য স্মরণীয় করে রাখলাম।(সূরা সাফফাত ১০২-১০৮)

কুরবানীর উদ্দেশ্যঃ
কুরবানী একটি গুরুত্বপূর্ণ ইবাদত। আল্লাহ রাব্বুল আলামিন মানব জাতিকে সৃষ্টি করেছেন শুধু তার ইবাদত করার জন্য। তাই আল্লাহ তা‘আলার বিধান তাঁর নির্দেশিত পথে পালন করতে হবে। তিনি বলেন :

﴿ وَمَا خَلَقۡتُ ٱلۡجِنَّ وَٱلۡإِنسَ إِلَّا لِيَعۡبُدُونِ﴾ [الذاريات: ٥٦]

‘আমি জিন ও মানুষকে এ জন্য সৃষ্টি করেছি যে, তারা শুধু আমার ইবাদত করবে।’ [সূরা আয্যারিয়াত-৫৬]

• আল্লাহ তা‘আলার পক্ষ থেকে কুরবানীর বিধান আমাদের উপর আসার বেশ কিছূ উদ্দেশ্যও রয়েছে:

১. শর্তহীন আনুগত্য
আল্লাহ তা‘আলা তার বান্দাহকে যে কোনো আদেশ দেয়ার ইখতিয়ার রাখেন এবং বান্দাহ তা পালন করতে বাধ্য। তাই তার আনুগত্য হবে শর্তহীন। আল্লাহর আদেশ সহজ হোক আর কঠিন হোক তা পালন করার বিষয়ে একই মন-মানসিকতা থাকতে হবে এবং আল্লাহর হুকুম মানার বিষয়ে মায়া-মমতা প্রতিবন্ধক হতে পারে না। ইবরাহীম আলাইহিস সালাম এর আনুগত্য ছিল শর্তহীন। এ জন্য মহান আল্লাহ যেভাবে বিশ্ব মানবমন্ডলীকে বিভিন্ন জাতিতে বিভক্ত করেছেন ঠিক সেভাবে সর্বশেষ জাতি হিসেবে মুসলিম জাতির পিতাও মনোনয়ন দিয়েছেন । কুরআনে এসেছে :
﴿مِّلَّةَ أَبِيكُمۡ إِبۡرَٰهِيمَۚ هُوَ سَمَّىٰكُمُ ٱلۡمُسۡلِمِينَ﴾ [الحج: ٧٨]
‘এটা তোমাদের পিতা ইবরাহীমের মিল্লাত; তিনি পূর্বে তোমাদের নামকরণ করেছেন মুসলিম।’ [সূরা আল–হাজ্জ : ৭৮]

২. তাকওয়া অর্জন
তাকওয়া অর্জন ছাড়া আল্লাহর নৈকট্য লাভ করা যায় না। একজন মুসলিমের অন্যতম চাওয়া হলো আল্লাহ তা‘আলার নৈকট্য অর্জন। পশুর রক্ত প্রবাহিত করার মাধ্যমে কুরবানী দাতা আল্লাহ রাব্বুল আলামিনের নৈকট্য অর্জন করেন। যেমন আল্লাহ তা‘আলা বলেন :
﴿ لَن يَنَالَ ٱللَّهَ لُحُومُهَا وَلَا دِمَآؤُهَا وَلَٰكِن يَنَالُهُ ٱلتَّقۡوَىٰ مِنكُمۡۚ كَذَٰلِكَ سَخَّرَهَا لَكُمۡ لِتُكَبِّرُواْ ٱللَّهَ عَلَىٰ مَا هَدَىٰكُمۡۗ وَبَشِّرِ ٱلۡمُحۡسِنِينَ ٣٧ ﴾ [الحج: ٣٧]

‘আল্লাহর নিকট পৌঁছায় না তাদের গোশত এবং রক্ত, বরং পৌঁছায় তোমাদের তাকওয়া। এভাবে তিনি এগুলোকে তোমাদের অধীন করে দিয়েছেন যাতে তোমরা আল্লাহর শ্রেষ্ঠত্ব ঘোষণা কর এজন্য যে, তিনি তোমাদের পথ-প্রদর্শন করেছেন; সুতরাং আপনি সুসংবাদ দিন সৎকর্মপরায়ণদেরকে। [সূরা আল-হাজ্জ: ৩৭]

৩. আল্লাহর শ্রেষ্ঠত্ব ঘোষণা করা
প্রত্যেক ইবাদাতই আল্লাহর শ্রেষ্ঠত্বের প্রমাণ বহন করে। তাই কুরবানীর মাধ্যমে আল্লাহর শ্রেষ্ঠত্ব ঘোষণা করা হয়। যেমন আল্লাহ তা‘আলা বলেন :
﴿كَذَٰلِكَ سَخَّرَهَا لَكُمۡ لِتُكَبِّرُواْ ٱللَّهَ عَلَىٰ مَا هَدَىٰكُمۡۗ وَبَشِّرِ ٱلۡمُحۡسِنِينَ ٣٧ ﴾ [الحج: ٣٧]
‘এভাবে তিনি এগুলোকে তোমাদের অধীন করে দিয়েছেন যাতে তোমরা আল্লাহর শ্রেষ্ঠত্ব ঘোষণা কর এজন্য যে, তিনি তোমাদের পথ-প্রদর্শন করেছেন; সুতরাং আপনি সুসংবাদ দিন সৎকর্মপরায়ণদেরকে। [সূরা আল-হাজ্জ: ৩৭]

৪. ত্যাগ করার মহান পরীক্ষা
কুরবানীর অন্যতম উদ্দেশ্য হলো ত্যাগ করার মানসিকতা তৈরী করা। আল্লাহর বিধান পালনে জান-মালের ত্যাগ স্বীকার করতে হবে। কুরবানীর ঈদকে গোশত খাওয়ার অনুষ্ঠানে পরিণত করা নয়, বরং নিজেদের মধ্যকার পশুসুলভ আচরণ ত্যাগ করার জন্য প্রস্তুত থাকতে হবে। নফসের আনুগত্য ত্যাগ করে আল্লাহর একান্ত অনুগত হওয়াই কুরবানীর উদ্দেশ্য।
﴿ وَلَنَبۡلُوَنَّكُم بِشَيۡءٖ مِّنَ ٱلۡخَوۡفِ وَٱلۡجُوعِ وَنَقۡصٖ مِّنَ ٱلۡأَمۡوَٰلِ وَٱلۡأَنفُسِ وَٱلثَّمَرَٰتِۗ وَبَشِّرِ ٱلصَّٰبِرِينَ ١٥٥ ﴾ [البقرة: ١٥٥] ‘

আমি তোমাদেরকে অবশ্যই ভয়, দারিদ্র্য, সম্পদ ও জীবনের ক্ষয়ক্ষতি করার মাধ্যমে পরীক্ষা করবো।’ [সূরা আল-বাকারাহ: ১৫৫]

৭. কুরবানীর মাধ্যমে সামাজিক ও পারিবারিক ঐক্য প্রতিষ্ঠা করার বিশেষ সুযোগ সৃষ্টি হয়। সমাজে আল্লাহর বিধান প্রতিষ্ঠার জন্য ঐক্যবদ্ধভাবে কাজ করার প্রেরণা তৈরি হয়। আল্লাহ তা‘আলা বলেন :

﴿ وَٱعۡتَصِمُواْ بِحَبۡلِ ٱللَّهِ جَمِيعٗا وَلَا تَفَرَّقُواْۚ﴾ [ال عمران: ١٠٣]

তোমারা আল্লাহর রজ্জুকে ঐক্যবদ্ধভাবে আঁকড়ে ধর এবং পরস্পর বিচ্ছিন্ন হয়ো না। [সূরা আলে ইমরান : ১০৩]

৮. কুরবানীতে গরীব মানুষের অনেক উপকার হয়। যারা বছরে একবারও গোশত্ খেতে পারে না, তারাও গোশত্ খাবার সুযোগ পায়। দারিদ্র বিমোচনেও এর গুরুত্ব রয়েছে। কুরবানীর চামড়ার টাকা গরীবের মাঝে বণ্টন করার মাধ্যমে গরীব-দুখী মানুষের প্রয়োজন মেটানো সম্ভব। অপরদিকে কুরবানীর চামড়া অর্থনীতিতে একটি বিরাট ভূমিকা পালন করে থাকে।

কুরবানীর তাৎপর্য সম্পর্কে আল কুরআনে দ্ব্যর্থহীন ভাষায় বলা হয়েছে, ‘ওসব (কুরবানীর) পশুর রক্ত গোশ্ত আল্লাহর দরবারে কিছুই পৌঁছে না। বরঞ্চ তোমাদের পক্ষ থেকে তার কাছে পৌঁছে তোমাদের তাকওয়া-খোদাভীতি। (সূরা হাজ্জ-৩৭) মূলত: গোশত ও রক্তের নাম কুরবানী নয়, কুরবানী হল আল্লাহ তা’য়ালার নির্দেশ পালন, আত্মত্যাগ ও সকল কুপ্রবৃত্তির ওপর ছুরি চালানোর নাম। কালোবাজারি ও অসদুপায়ে উপার্জিত সম্পদ দিয়ে কুরবানী করলে তা গৃহীত হবে না। হাদীস শরীফে এরশাদ হয়েছে ‘আল্লাহ তা’য়ালা হালাল বস্তু ছাড়া আর কোন কিছুই কবুল করেন না। (ছহীহুল বুখারী)।

ঈদের নামাজের নিয়ম:
প্রথমে মুখে বা মনে মনে নিয়ত করে নেবে, ঈদুল-ফিতর এর দু’রাকাত ওয়াজিব নামাজ অতিরিক্ত ছয় তাকবীরসহ ইমামের সঙ্গে পড়ছি। তাপর ‘আল্লাহু আকবার’ বলে হাত বেঁধে নেবে এবং সানা পড়বে। তারপর ঈদেৱ নামাযেৱ তাকবিৱ দিবে তিনটা, ওপ্ৰথম ও দিত্বীয় তাকবিৱ দিয়ে হাত কান পর্যন্ত হাত উঠিয়ে ছেড়ে দেবে এবং তৃতীয় তাকবীরে হাত উঠিয়ে বেঁধে নেবে। তারপর স্বাভাবিক নিয়মে প্রথম রাকাত শেষ করবে।

দ্বিতীয় রাকাতে ফাতিহা ও সূরা পাঠ শেষে ইমাম যখন তাকবীর বলবেন, তার সঙ্গে প্রথম, দ্বিতীয় ও তৃতীয় তাকবীরে হাত কান পর্যন্ত উঠাতে হবে এবং ছেড়ে দিতে হবে। আর চতুর্থবার তাকবীর বলে হাত না উঠিয়ে সোজা রুকুতে চলে যেতে হবে। বাকিটুকু যথা নিয়মে শেষ করে খুতবা শুনে, দোয়া-মুনাজাত করে বাসা-বাড়িতে ফিরে যেতে হবে।

উপসংহার:
আল্লাহ আমাদের সবাইকে নিয়ত সঠীক করে একমাত্র আল্লাহর জন্য কোরবানী করার তাওফীক দান করুন৷আমীন৷

যবেহ করার সময় বিশেষ লক্ষণীয় ও কর্তব্য

১। পশুর প্রতি দয়া করা ও অনুগ্রহ প্রদর্শন করা। আর তা নিম্ন পদ্ধতিতে সম্ভব;

(ক) সেইরূপ ব্যবস্থা নিয়ে যবেহ করা, যাতে পশুর অধিক কষ্ট না হয় এবং সহজেই সে প্রাণত্যাগ করতে পারে।

(খ) যবেহ যেন খুব তীক্ষ্ম ধারালো অস্ত্র দ্বারা হয় এবং তা খুবই শীঘ্রতা ও শক্তির সাথে যবেহস্থলে (গলায়) পেঁচানো হয়।

ফলকথা, পশুর বিনা কষ্টে খুবই শীঘ্রতার সাথে তার প্রাণ বধ করাই উদ্দেশ্য। এ বিষয়ে দয়ার নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেন, ‘‘অবশ্যই আল্লাহ প্রত্যেক বস্ত্তর উপর অনুগ্রহ লিপিবদ্ধ (জরুরী) করেছেন। সুতরাং যখন (জিহাদ বা হদ্দে) হত্যা কর তখন উত্তমরূপে অনুগ্রহের সাথে হত্যা কর এবং যখন যবেহ কর তখন উত্তমরূপে অনুগ্রহের সাথে যবেহ কর। তোমাদের উচিত, ছুরিকে ধারালো করা এবং বধ্য পশুকে আরাম দেওয়া।’’[1]

বধ্য পশুর সম্মুখেই ছুরি শান দেওয়া উচিত নয় (মকরূহ)। যেহেতু নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ছুরি শান দিতে এবং তা পশু থেকে গোপন করতে আদেশ করেছেন এবং বলেছেন, ‘‘যখন তোমাদের কেউ যবেহ করবে, তখন সে যেন তাড়াতাড়ি করে।’’[2]

আর যেহেতু পশুর চোখের সামনেই ছুরি ধার দেওয়ায় তাকে চকিত করা হয়; যা বাঞ্ছিত অনুগ্রহ ও দয়াশীলতার প্রতিকূল।

তদনুরূপ এককে অপরের সামনে যবেহ করা এবং ছেঁচ্ড়ে যবেহস্থলে টেনে নিয়ে যাওয়াও মকরূহ।

২। কুরবানী যদি উঁট হয়, (অথবা এমন কোন পশু হয় যাকে আয়ত্ত করা সম্ভব নয়), তাহলে তাকে বাম পা বাঁধা অবস্থায় দাঁড় করিয়ে নহর করা হবে। আল্লাহ পাক বলেন, ‘‘সুতরাং দন্ডায়মান অবস্থায় ওদের যবেহকালে তোমরা আল্লাহর নাম নাও।’’ (কুঃ ২২/৩৬)

ইবনে আববাস (রা.) এই আয়াতের তফসীরে বলেন, ‘বাম পা বেঁধে তিন পায়ের উপর দন্ডায়মান অবস্থায় (নহর করা হবে)।’[3]

যদি উঁট ছাড়া অন্য পশু হয় তাহলে তা বামকাতে শয়নাবস্থায় যবেহ করা হবে। যেহেতু তা সহজ এবং ডান হাতে ছুরি নিয়ে বাম হাত দ্বারা মাথায় চাপ দিয়ে ধরতে সুবিধা হবে। তবে যদি যবেহকারী নেটা বা বেঁয়ো হয় তাহলে সে পশুকে ডানকাতে শুইয়ে যবেহ করতে পারে। যেহেতু সহজ উপায়ে যবেহ করা ও পশুকে আরাম দেওয়াই উদ্দেশ্য।

পশুর গর্দানের এক প্রান্তে পা রেখে যবেহ করা মুস্তাহাব। যাতে পশুকে অনায়াসে কাবু করা যায়। কিন্তু গর্দানের পিছন দিকে পা মুচ্ড়ে ধরা বৈধ নয়। কারণ, তাতে পশু অধিক কষ্ট পায়।

৩। যবেহকালে পশুকে কেবলামুখে শয়ন করাতে হবে।[4] অন্যমুখে শুইয়েও যবেহ করা সিদ্ধ হবে। যেহেতু কেবলামুখ করে শুইয়ে যবেহ করা ওয়াজেব হওয়ার ব্যাপারে কোন শুদ্ধ প্রমাণ নেই।[5]

৪। যবেহকালে আল্লাহর নাম নেওয়া (‘বিসমিল্লাহ’ বলা) ওয়াজেব। আল্লাহ তাআলা বলেন, ‘‘যদি তোমরা তাঁর নিদর্শনসমূহের বিশ্বাসী হও তবে যাতে (যে পশুর যবেহ করার সময়) আল্লাহর নাম নেওয়া হয়েছে তা আহার কর।’’ (কুঃ ৬/১১৮) ‘‘এবং যাতে আল্লাহর নাম নেওয়া হয়নি তা হতে তোমরা আহার করো না; উহা অবশ্যই পাপ।’’ (কুঃ ৬/১২১)

আর নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেন, ‘‘যা খুন বহায় এবং যাতে আল্লাহর নাম নেওয়া হয় তা ভক্ষণ কর।’’[6]

‘বিসমিল্লাহ’র সাথে ‘আল্লাহু আকবার’ যুক্ত করা মুস্তাহাব। অবশ্য এর সঙ্গে কবুল করার দুআ ছাড়া অন্য কিছু অতিরিক্ত করা বিধেয় নয়। অতএব (কুরবানী কেবল নিজের তরফ থেকে হলে) বলবে, ‘বিসমিল্লাহি অল্লাহু আকবার, আল্লাহুম্মা ইন্না হাযা মিন্কা অলাক, আল্লাহুম্মা তাক্বাববাল মিন্নী।’

নিজের এবং পরিবারের তরফ থেকে হলে বলবে,‘—তাক্বাববাল মিন্নী অমিন আহলে বাইতী।’ অপরের নামে হলে বলবে, ‘—তাক্বাববাল মিন (এখানে যার তরফ থেকে কুরবানী তার নাম নেবে)[7]

এই সময় নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর উপর দরূদ পাঠ করা বিধেয় নয়; বরং তা বিদআত।[8] যেমন ‘বিসমিল্লাহ’র সাথে ‘আর-রাহমানির রাহীম’ যোগ করাও সুন্নত নয়। যেহেতু এ সম্বন্ধে কোন দলীল নেই। যেমন যবেহ করার লম্বা দুআ ‘ইন্নী অজ্জাহ্তু’ এর হাদীস যয়ীফ।[9]

যবেহর ঠিক অব্যবহিত পূর্বে ‘বিসমিল্লাহ’ পাঠ জরুরী। এর পর যদি লম্বা ব্যবধান পড়ে যায়, তাহলে পুনরায় তা ফিরিয়ে বলতে হবে। তবে ছুরি ইত্যাদি হাতে নিয়ে প্রস্ত্ততি নেওয়ায় যেটুকু ব্যবধান পড়ে তাতে ‘বিসমিল্লাহ’ ফিরিয়ে পড়তে হয় না।

আবার ‘বিসমিল্লাহ’ শুধু সেই পশুর জন্যই পরিগণিত হবে যাকে যবেহ করার সঙ্কল্প করা হয়েছে। অতএব এক পশুর জন্য ‘বিসমিল্লাহ’ পড়ে অপর পশু যবেহ বৈধ নয়। বরং অপরের জন্য পুনরায় ‘বিসমিল্লাহ’ পড়া জরুরী। অবশ্য ‘বিসমিল্লাহ’ বলার পর অস্ত্র পরিবর্তন করাতে আর পুনরায় পড়তে হয় না।

প্রকাশ যে, যবেহর পর পঠনীয় কোন দুআ নেই।

৫। যবেহতে খুন বহা জরুরী। আর তা দুই শাহরগ (কন্ঠনালীর দুই পাশে দু’টি মোটা আকারের শিরা) কাটলে অধিকরূপে সম্ভব হয়। প্রিয় নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেন, ‘‘যা খুন বহায়, যাতে আল্লাহর নাম নেওয়া হয় তা ভক্ষণ কর। তবে যেন (যবেহ করার অস্ত্র) দাঁত বা নখ না হয়।’’[10]

সুতরাং রক্ত প্রবাহিত ও শুদ্ধ যবেহ হওয়ার জন্য চারটি অঙ্গ কাটা জরুরী; শক্ষাসনালী, খাদ্যনালী এবং পাশর্ক্ষস্থ দুই মোটা শিরা।

৬। প্রাণ ত্যাগ করার পূর্বে পশুর অন্য কোন অঙ্গ কেটে কষ্ট দেওয়া হারাম। যেমন ঘাড় মটকানো, পায়ের শিরা কাটা, চামড়া ছাড়ানো ইত্যাদি জান যাওয়ার আগে বৈধ নয়। অনুরূপভাবে দেহ আড়ষ্ট হয়ে এলে চামড়া ছাড়াতে শুরু করার পর যদি পুনরায় লাফিয়ে ওঠে তাহলে আরো কিছুক্ষণ প্রাণ ত্যাগ করা কাল পর্যন্ত অপেক্ষা করবে। যেহেতু অন্যভাবে পশুকে কষ্ট দেওয়া আদৌ বৈধ নয়।

পশু পালিয়ে যাওয়ার ভয় থাকলেও ঘাড় মটকানো যাবে না। বরং তার বদলে কিছুক্ষণ ধরে রাখা অথবা (হাঁস-মুরগীকে ঝুড়ি ইত্যাদি দিয়ে) চেপে রাখা যায়।

যবেহ করার সময় পশুর মাথা যাতে বিচ্ছিন্ন না হয় তার খেয়াল রাখা উচিত। তা সত্ত্বেও যদি কেটে বিচ্ছিন্ন হয়েই যায়, তাহলে তা হালাল হওয়ার ব্যাপারে কোন সন্দেহ নেই।

যবাই করে ছেড়ে দেওয়ার পর (অসম্পূর্ণ হওয়ার ফলে) কোন পশু উঠে পালিয়ে গেলে তাকে ধরে পুনরায় যবাই করা যায়। নতুবা কিছু পরেই সে এমনিতেই মৃত্যুর দিকে ঢলে পড়ে। আর তা হালাল।

প্রকাশ থাকে যে, যবেহ করার জন্য পবিত্রতা বা যবেহকারীকে পুরুষ হওয়া শর্ত নয়। যেমন মাথায় টুপী রাখা বা মাথা ঢাকাও বিধিবদ্ধ নয়। অবশ্য বিশ্বাস ও ঈমানের পবিত্রতা জরুরী। সুতরাং কাফের, মুশরিক (মাযার বা কবরপূজারী) ও বেনামাযীর হাতে যবেহ শুদ্ধ নয়।

যেমন যবেহ করার আগে কুরবানীর পশুকে গোসল দেওয়া, তার খুর ও শিঙে তেল দেওয়া অথবা তার অন্য কোন প্রকার তোয়ায করা বিদআত।

প্রকাশ থাকে যে, যবেহকৃত পশুর রক্ত হারাম। অতএব তা কোন ফল লাভের উদ্দেশ্যে পায়ে মাখা, দেওয়ালে ছাপ দেওয়া বা তা নিয়ে ছুড়াছুড়ি করে খেলা করা বৈধ নয়।

[1] (মুসলিম ১৯৫৫নং) [2] (মুসনাদ আহমাদ ২/১০৮, ইবনে মাজাহ ৩১৭২নং, সহীহ তারগীব ১/৫২৯) [3] (তাফসীর ইবনে কাষীর) [4] (আবূ দাঊদ, ইবনে মাজাহ ২/১০৪৩, হাদীসটির সনদে সমালোচনা করা হয়েছে) [5] (আহকামুল উযহিয়্যাহ ৮৮,৯৫পৃঃ) [6] (বুখারী ২৩৫৬, মুসলিম ১৯৬৮নং) [7] (মানাসিকুল হাজ্জ, আলবানী ৩৬পৃঃ) [8] (আল-মুমতে ৭/৪৯২) [9] (যয়ীফ আবূ দাঊদ ৫৯৭নং) [10] (আহমাদ, বুখারী, মুসলিম প্রভৃতি, সহীহুল জামে’ ৫৫৬৫নং)

কুরবানীর আহকাম

কুরবানী করা আল্লাহর এক ইবাদত। আর কিতাব ও সুন্নাহয় এ কথা প্রমাণিত যে, কোন আমল নেক, সালেহ বা ভালো হয় না, কিংবা গৃহীত ও নৈকট্যদানকারী হয় না; যতক্ষণ না তাতে দু’টি শর্ত পূরণ হয়েছে;

প্রথমতঃ ইখলাস। অর্থাৎ, তা যেন খাঁটি আল্লাহরই উদ্দেশ্যে হয়। তা না হলে তা আল্লাহর দরবারে কবুল হবে না। যেমন কাবীলের নিকট থেকে কুরবানী কবুল করা হয়নি এবং তার কারণ স্বরূপ হাবীল বলেছিলেন,

(إِنَّمَا يَتَقَبَّلُ اللهُ مِنَ الْمُتَّقِينَ)

অর্থাৎ, আল্লাহ তো মুত্তাক্বী (পরহেযগার ও সংযমী)দের কুরবানীই কবুল করে থাকেন।[1]

এ ব্যাপারে মহান আল্লাহ বলেন,

(لَن يَنَالَ اللهَ لُحُومُهَا وَلَا دِمَاؤُهَا وَلَكِن يَنَالُهُ التَّقْوَى مِنكُمْ كَذَلِكَ سَخَّرَهَا لَكُمْ لِتُكَبِّرُوا اللهَ عَلَى مَا هَدَاكُمْ وَبَشِّرِ الْمُحْسِنِينَ)

অর্থাৎ, আল্লাহর কাছে কখনোও ওগুলির গোশত পৌঁছে না এবং রক্তও না; বরং তাঁর কাছে পৌঁছে তোমাদের তাকওয়া (সংযমশীলতা); এভাবে তিনি ওগুলিকে তোমাদের অধীন করে দিয়েছেন যাতে তোমরা আল্লাহর শ্রেষ্ঠত্ব ঘোষণা কর এই জন্য যে, তিনি তোমাদেরকে পথ প্রদর্শন করেছেন। আর তুমি সুসংবাদ দাও সৎকর্মশীলদেরকে।[2]

দ্বিতীয়তঃ তা যেন আল্লাহ ও তদীয় রসূলের নির্দেশিত বিধি-বিধান অনুযায়ী হয়। আল্লাহ তাআলা বলেন,

(فَمَنْ كَانَ يَرْجُوا لِقَاءَ رَبِّهِ فَلْيَعْمَلْ عَمَلاً صَالِحاً وَّلاَ يُشْرِكْ بِعِبَادَةِ رَبِّهِ أَحَدا)

অর্থাৎ, যে তার প্রতিপালকের সাক্ষাৎ কামনা করে, সে যেন সৎকর্ম করে এবং তার প্রতিপালকের ইবাদতে কাউকে শরীক না করে।[3]

সুতরাং যারা কেবল বেশী করে গোশত খাওয়ার উদ্দেশ্যে কুরবানী দেয় অথবা লোক সমাজে নাম কুড়াবার উদ্দেশ্যে মোটা-তাজা অতিরিক্ত মূল্যের পশু ক্রয় করে এবং তা প্রদর্শন ও প্রচার করে থাকে তাদের কুরবানী যে ইবাদত নয় -তা বলাই বাহুল্য।

গোশত খাওয়ার উদ্দেশ্য থাকে বলেই লোকে একই মূল্যের একটি গোটা কুরবানী না দিয়ে একটি ভাগ দিয়ে থাকে। বলে, একটি ছাগল দিলে দু’দিনেই শেষ হয়ে যাবে। লোকের ছেলেরা খাবে, আর আমার ছেলেরা তাকিয়ে দেখবে? উদ্দেশ্য সুস্পষ্ট।

[1] (সূরা মায়িদাহ ২৭ আয়াত) [2] (সূরা হাজ্জ ৩৭ আয়াত) [3](সূরা কাহফ ১১০ আয়াত)

কুরবানীর প্রারম্ভিক ইতিহাস

কুরবানীর ইতিহাস খুবই প্রাচীন। সেই আদি পিতা আদম (আলাইহিস সালাম)-এর যুগ থেকেই কুরবানীর বিধান চলে আসছে। আদম (আলাইহিস সালাম)-এর দুই ছেলে হাবীল ও কাবীলের কুরবানী পেশ করার কথা আমরা মহাগ্রন্থ আল-কুরআন থেকে জানতে পারি। মহান আল্লাহ বলেন,

(وَاتْلُ عَلَيْهِمْ نَبَأَ ابْنَيْ آدَمَ بِالْحَقِّ إِذْ قَرَّبَا قُرْبَاناً فَتُقُبِّلَ مِنْ أَحَدِهِمَا وَلَمْ يُتَقَبَّلْ مِنْ الآخَرِ قَالَ لأَقْتُلَنَّكَ قَالَ إِنَّمَا يَتَقَبَّلُ اللهُ مِنْ الْمُتَّقِينَ)

অর্থাৎ, আদমের দুই পুত্রের (হাবিল ও কাবিলের) বৃত্তান্ত তুমি তাদেরকে যথাযথভাবে শুনিয়ে দাও, যখন তারা উভয়ে কুরবানী করেছিল, তখন একজনের কুরবানী কবুল হল এবং অন্য জনের কুরবানী কবুল হল না। তাদের একজন বলল, আমি তোমাকে অবশ্যই হত্যা করব। অপরজন বলল, আল্লাহ তো সংযমীদের কুরবানীই কবুল করে থাকেন।[1]

কুরবানীর বিধান প্রত্যেক জাতির জন্যই ছিল।

মহান আল্লাহ বলেন,

(وَلِكُلِّ أُمَّةٍ جَعَلْنَا مَنْسَكاً لِيَذْكُرُوا اسْمَ اللهِ عَلَى مَا رَزَقَهُمْ مِنْ بَهِيمَةِ الأَنْعَامِ فَإِلَهُكُمْ إِلَهٌ وَاحِدٌ فَلَهُ أَسْلِمُوا وَبَشِّرْ الْمُخْبِتِينَ – الَّذِينَ إِذَا ذُكِرَ اللهُ وَجِلَتْ قُلُوبُهُمْ وَالصَّابِرِينَ عَلَى مَا أَصَابَهُمْ وَالْمُقِيمِ الصَّلاةِ وَمِمَّا رَزَقْنَاهُمْ يُنْفِقُونَ)

অর্থাৎ, আমি প্রত্যেক সম্প্রদায়ের জন্য কুরবানীর বিধান দিয়েছি; যাতে আমি তাদেরকে জীবনোপকরণ সবরূপ যে সব চতুষ্পদ জন্তু দিয়েছি সেগুলির উপর আল্লাহর নাম উচ্চারণ করে। তোমাদের উপাস্য একমাত্র উপাস্য। সুতরাং তোমরা তাঁরই নিকট আত্মসমর্পণ কর। আর সুসংবাদ দাও বিনীতগণকে; যাদের হূদয় ভয়ে কম্পিত হয় আল্লাহর নাম স্মরণ করা হলে, যারা তাদের বিপদ-আপদে ধৈর্যধারণ করে, নামায কায়েম করে এবং আমি তাদেরকে যে রুযী দিয়েছি তা হতে ব্যয় করে।[2]

ইবরাহীম (আলাইহিস সালাম)-এর কুরবানীর আদর্শ হওয়ার ব্যাপারে মহান আল্লাহ বলেন,

(فَلَمَّا بَلَغَ مَعَهُ السَّعْيَ قَالَ يَا بُنَيَّ إِنِّي أَرَى فِي الْمَنَامِ أَنِّي أَذْبَحُكَ فَانظُرْ مَاذَا تَرَى قَالَ يَا أَبَتِ افْعَلْ مَا تُؤْمَرُ سَتَجِدُنِي إِن شَاء اللهُ مِنَ الصَّابِرِينَ- فَلَمَّا أَسْلَمَا وَتَلَّهُ لِلْجَبِينِ- وَنَادَيْنَاهُ أَنْ يَا إِبْرَاهِيمُ- قَدْ صَدَّقْتَ الرُّؤْيَا إِنَّا كَذَلِكَ نَجْزِي الْمُحْسِنِينَ- إِنَّ هَذَا لَهُوَ الْبَلَاء الْمُبِينُ- وَفَدَيْنَاهُ بِذِبْحٍ عَظِيمٍ – وَتَرَكْنَا عَلَيْهِ فِي الْآخِرِينَ)

অর্থাৎ, অতঃপর সে (ইসমাঈল) যখন পিতা (ইবরাহীমের)র সাথে চলা-ফিরার (কাজ করার) বয়সে উপনীত হল, তখন ইবরাহীম তাকে বলল, ‘হে বেটা! আমি সবপ্নে দেখি যে, তোমাকে যবেহ করছি; এখন তোমার অভিমত কি দেখ।’ সে বলল, ‘আববা! আপনাকে যা আদেশ করা হয়েছে, আপনি তা পালন করুন। ইনশাআল্লাহ, আপনি আমাকে ধৈর্যশীলরূপে পাবেন।’ অনন্তর পিতা-পুত্র উভয়েই যখন আনুগত্য প্রকাশ করল এবং ইবরাহীম তাকে যবেহ করার জন্য অধোমুখে শায়িত করল, তখন আমি ডেকে বললাম, ‘হে ইবরাহীম! তুমি তো স্বপ্নকে বাস্তবে পরিণত করে দেখালে। আমি এভাবেই সৎকর্মীদেরকে প্রতিদান দিয়ে থাকি। নিশ্চয় এটা এক সুস্পষ্ট পরীক্ষা। আর আমি তার পরিবর্তে যবেহ করার জন্য এক মহান জন্তু দিয়ে তাকে মুক্ত করে নিলাম। আর তার জন্য এ বিষয়টি পরবর্তীদের জন্য স্মরণীয় করে রাখলাম।[3]

প্রকাশ যে, স্বপ্ন দেখে ইবরাহীম (আলাইহিস সালাম)-এর ৩ সকাল উঁট কুরবানী করার কথা শুদ্ধ নয়।

[1] (সূরা মাইদাহ ২৭ আয়াত) [2] (সূরা হাজ্জ ৩৪-৩৫) [3] (সূরা সাফফাত ১০২-১০৮)

যুলহজ্জের প্রথম দশ দিন

আল্লাহ তাআলার প্রত্যেক কাজ বা সৃষ্টি হিকমতে ভরপুর প্রত্যেক বস্তুতে তাঁর প্রতিপালকত্বের দলীল এবং একত্বের সাক্ষ্য বিদ্যমান। তাঁর সকল কর্মেই পরিস্ফুটিত হয় তাঁর প্রত্যেক মহামহিমান্বিত ও গৌরবান্বিত গুণ। কিছু সৃষ্টিকে কিছু মর্যাদা ও বিশেষ গুণ দ্বারা নির্দিষ্ট করা, কিছু সময় ও স্থানকে অন্যান্যের উপর প্রাধান্য ও গুরুত্ব দেওয়ার কর্মও তাঁর ঐ হিকমত ও মহত্বের অন্যতম।

আল্লাহ পাক কিছু মাস, দিন ও রাত্রিকে অপরাপর থেকে শ্রেষ্ঠত্ব দান করেছেন; যাতে তা মুসলিমের আমল বৃদ্ধিতে সহযোগী হয়। তাঁর আনুগত্যে ও ইবাদতে মনোযোগ বৃদ্ধি পায় এবং কর্মঠ মনে নতুন কর্মোদ্যম পুনঃ পুনঃ জাগরিত হয়। অধিক সওয়াবের আশায় সেই কাজে মনের লোভ জেগে ওঠে এবং তার বড় অংশ হাসিলও করে থাকে বান্দা। যাতে মৃত্যু আসার পূর্বে যথা সময়ে তার প্রস্তুতি এবং পুনরুত্থানের জন্য যথেষ্ট পাথেয় সংগ্রহ করে নিতে পারে।

শরীয়তে নির্দিষ্ট ইবাদতের মৌসম এই জন্যই করা হয়েছে যাতে ঐ সময়ে ইবাদতে অধিক মনোযোগ ও প্রয়াস লাভ হয় এবং অন্যান্য সময়ে অসম্পূর্ণ অথবা স্বল্প ইবাদতের পরিপূর্ণতা ও আধিক্য অর্জন এবং তাওবাহ করার সুযোগ লাভ হয়।

ঐ ধরনের প্রত্যেক গুরুত্বপূর্ণ মৌসমেরই নির্দিষ্ট এক একটা ওযীফাহ ও করণীয় আছে; যার দ্বারায় আল্লাহর সান্নিধ্য লাভ করা যায়। সেই সময়ে আল্লাহ পাকের বিশেষ অনুগ্রহ ও করুণা আছে; যার দ্বারায় আল্লাহ তাঁর বান্দাদের মধ্যে যাকে ইচ্ছা পুরস্কৃত করে থাকেন। অতএব সৌভাগ্যশালী সেই হবে, যে ঐ নির্দিষ্ট মাস বা কয়েক ঘণ্টার মৌসমে নির্দিষ্ট ওযীফাহ ও ইবাদতের মাধ্যমে নিজ মওলার সামীপ্য অর্জন করতে সক্ষম হবে। আর সম্ভবতঃ তাঁর অনুগ্রহের অধিকারী হয়ে পরকালে জাহান্নাম ও তাঁর ভীষণ অনলের কবল হতে নিষ্কৃতি পাবে।

আমল ও ইবাদতের নির্দিষ্ট মৌসমসমূহে আল্লাহর অনুগত ও দ্বীনদার বান্দা লাভবান হয় এবং অবাধ্য ও অলস বান্দা ক্ষতির শিকার হয়। তাই তো মুসলিমের উচিত, আয়ুর মর্যাদা ও জীবনের মূল্য সম্পর্কে সবিশেষ অবহিত হওয়া এবং সেই সঙ্গে আল্লাহর ইবাদত অধিকরূপে করা ও মরণাবধি সৎকার্যে অবিচল প্রতিষ্ঠিত থাকা। আল্লাহ তাআলা বলেন,

(وَاعْبُدْ رَبَّكَ حَتّى يَأْتِيَكَ الْيَقِيْن)

অর্থাৎ, ‘‘তোমার ইয়াকীন উপস্থিত হওয়া পর্যন্ত তুমি তোমার প্রতিপালকের উপাসনা কর।’’ (কুঃ ১৫/৯৯)

সালেম বিন আব্দুল্লাহ (রহ.) বলেন, ‘ইয়াকীন’ (সুনিশ্চয়তা) অর্থাৎ মৃত্যু। অনুরূপ বলেছেন মুজাহিদ, হাসান, কাতাদাহ প্রভৃতি মুফাসসিরগণও।[1]

আল্লাহ তাআলা যুলহাজ্জের প্রথম দশ দিনকে অন্যান্য দিনের উপর শ্রেষ্ঠত্ব ও মর্যাদা দান করেছেন। আল্লাহর রসূল (সা.) বলেন। ‘‘এই দশ দিনের মধ্যে কৃত নেক আমলের চেয়ে আল্লাহর নিকট অধিক পছন্দনীয় আর কোন আমল নেই।’’ (সাহাবাগণ) বললেন, ‘আল্লাহর পথে জিহাদও নয় কি?’ তিনি বললেন, ‘‘আল্লাহর পথে জিহাদও নয়। তবে এমন কোন ব্যক্তি (এর আমল) যে নিজের জান-মাল সহ বের হয় এবং তারপর কিছুও সঙ্গে নিয়ে আর ফিরে আসে না।[2]

তিনি আরো বলেন, ‘‘আযহার দশ দিনের নেক আমলের চেয়ে অধিক পবিত্রতর ও প্রতিদানে অধিক বৃহত্তর আর কোন আমল আল্লাহ আয্যা অজাল্লার নিকট নেই।’’ বলা হল, ‘আল্লাহর পথে জিহাদও নয় কি?!’ তিনি বললেন, ‘‘আল্লাহর পথে জিহাদও নয়। তবে এমন ব্যক্তির (আমল) যে নিজের জানমাল সহ বহির্গত হয়, অতঃপর তার কিছুও সঙ্গে নিয়ে আর ফিরে আসে না।’’[3]

আব্দুল্লাহ বিন আমর (রা.) বলেন, একদা আমি রসূলুল্লাহ (সা.)-এর নিকট ছিলাম। অতঃপর আমলসমূহের কথা উত্থাপন করলাম। তিনি বললেন, ‘‘এই দশ দিন ছাড়া কোন এমন দিন নেই যাতে আমল অধিক উত্তম হতে পারে।’’ তাঁরা বললেন, ‘হে রসূলুল্লাহ! আল্লাহর রাস্তায় জিহাদ?’ তিনি তার গুরুত্ব বর্ণনা করলেন, অতঃপর বললেন, ‘‘জিহাদও নয়। তবে এমন কোন ব্যক্তি যে নিজের জান-মাল সহ আল্লাহর রাস্তায় বের হয় এবং তাতেই তার জীবনাবসান ঘটে।’’[4]

অতএব এই দলীলসমূহ হতে প্রমাণিত হয় যে, সারা বছরের সমস্ত দিনগুলি অপেক্ষা যুল হাজ্জের ঐ দশ দিনই বিনা বিয়োজনে উত্তম। এমন কি রমযানের শেষ দশ দিনও ঐ দশ দিনের চেয়ে উত্তম নয়।

ইবনে কাসীর (রঃ) বলেন, ‘মোট কথা বলা হয়েছে যে, এই দশদিন সারা বছরের মধ্যে শ্রেষ্ঠতম দিন; যেমনটি হাদীসের উক্তিতে প্রতীয়মান হয়। অনেকে রমযানের শেষ দশ দিনের উপরেও এই দিনগুলিকে প্রাধান্য দিয়েছেন। কারণ, যে নামায, রোযা, সাদকাহ ইত্যাদি আমল এই দিনগুলিতে পালনীয় ঐ আমলসমূহই ঐ দিনগুলিতেও পালনীয়। কিন্তু (যুলহাজ্জের) ঐ দিনগুলিতে ফরজ হাজ্জ আদায় করার অতিরিক্ত বৈশিষ্ট্য রয়েছে।’

আবার অনেকে বলেছেন (রমযানের) ঐ দিনগুলিই শ্রেষ্ঠ। কারণ, তাতে রয়েছে শবেকদর, যা হাজার মাস অপেক্ষা উত্তম।

কিন্তু এই দুয়ের মধ্যবর্তী কিছু উলামা বলেন, (যিলহাজ্জের) দিনগুলিই শ্রেষ্ঠ এবং রমযানের রাত্রিগুলি শ্রেষ্ঠ। অবশ্য এইভাবে সমস্ত দলীল সামঞ্জস্যপূর্ণ হয়। আর আল্লাহই বেশী জানেন।[5]

উক্ত দলীলসমূহ এই কথার প্রমাণ দেয় যে, প্রত্যেক নেক আমল (সৎকর্ম); যা এই দিনগুলিতে করা হয় তা আল্লাহর নিকট অধিক প্রিয়। অর্থাৎ, ঐ কাজই যদি অন্যান্য দিনে করা হয় তবে ততটা প্রিয় হয় না। আর যা আল্লাহর নিকট অধিক প্রিয় তা তাঁর নিকট সর্বোত্তম। আবার এই দিনগুলিতে আমল ও ইবাদতকারী সেই মুজাহিদ থেকেও উত্তম, যে নিজের জান-মাল সহ জিহাদ করে বাড়ি ফিরে আসে।

অথচ বিদিত যে, আল্লাহর রাহে জিহাদ ঈমানের পর সর্বোৎকৃষ্ট আমল। যেহেতু আবূ হুরাইরাহ (রা.) বলেন, এক ব্যক্তি জিজ্ঞাসা করল, ‘হে আল্লাহর রসূল! কোন আমল সবচেয়ে উৎকৃষ্ট?’ তিনি বললেন, ‘‘আল্লাহ ও তদীয় রসূলের প্রতি ঈমান।’’ সে বলল, ‘তারপর কি?’ তিনি বললেন, ‘‘আল্লাহর পথে জিহাদ।’’ সে বলল, ‘তারপর কি?’ তিনি বললেন, ‘‘গৃহীত হাজ্জ।’’[6]

কিন্তু পূর্বোক্ত হাদীসসমূহ হতে প্রতিপাদিত হয়েছে যে, বৎসরের অন্যান্য দিনের সকল প্রকার আমল অপেক্ষা যুলহাজ্জের ঐ দশদিনের আমল আল্লাহর নিকট অধিক উত্তম ও প্রিয়তম। সুতরাং ঐ দশ দিনের আমল যদিও জিহাদের তুলনায় শ্রেষ্ঠ নয়, তবুও অন্যান্য দিনের আমলের তুলনায় শ্রেষ্ঠতর; যদিও বা সেই আমল (অন্যান্য দিনে) শ্রেষ্ঠ। আর নবী (সা.) কোন আমলকে ব্যতিক্রান্ত করেননি। তবে এমন এক জিহাদের কথা উল্লেখ করেছেন যা সর্বোৎকৃষ্ট জিহাদ; যাতে মুজাহিদ শহীদ হয়ে যায় এবং আর ফিরে আসে না; যার ঐ আমল উক্ত দশ দিনের সমস্ত আমলের চেয়েও উত্তম।

কোন বস্তুকে যখন সাধারণভাবে শ্রেষ্ঠ বলা হয়, তখন তার এই অর্থ নয় যে, ঐ বস্তু সর্বাবস্থায় ও সকলের পক্ষেই শ্রেষ্ঠ। বরং অশ্রেষ্ঠও তার নির্দেশিত বিধিবদ্ধ স্থানে সাধারণ শ্রেষ্ঠ অপেক্ষা শ্রেষ্ঠতর হতে পারে। যেমন, জিহাদ সাধারণভাবে শ্রেষ্ঠ আমল। কিন্তু অশ্রেষ্ঠ কোন নেক আমল তার নির্দেশিত নির্দিষ্ট ঐ দশ দিনে করা হলে তা জিহাদ থেকেও শ্রেষ্ঠতর।

অনুরূপভাবে, যেমন রুকু ও সিজদার মধ্যে তাসবীহ পাঠ কুরআন পাঠ হতেও উত্তম। (বরং ঐ অবস্থায় কুরআন পাঠ অবৈধ।) অথচ কুরআন পাঠ সাধারণ সর্ববিধ তাসবীহ ও যিকর হতে উত্তম।[7]

যুলহাজ্জের এই দশ দিনের ফযীলত ও শ্রেষ্ঠত্ব বিভিন্ন দিক দিয়ে প্রতিপন্ন হয়ঃ-

১। আল্লাহ তাআলা এই দিনগুলির শপথ করেছেন। আর কোন জিনিসের নামে শপথ তার শ্রেষ্ঠত্ব ও মাহাত্ম্যেরই প্রমাণ। আল্লাহ পাক বলেন, ‘‘শপথ ঊষার, শপথ দশ রজনীর—-।’’

(সূরা ফাজ্র১-২ আয়াত)

ইবনে আব্বাস (রা.) ইবনে যুবাইর (রা.) প্রভৃতি সলফগণ বলেন, ‘নিশ্চয় ঐ দশ রাত্রি বলতে যুলহাজ্জের দশ দিনকে বুঝানো হয়েছে।’ ইবনে কাসীর (রহ.) বলেন, ‘এটাই সঠিক।’ শাওকানী (রহ.) বলেন, ‘এই অভিমত অধিকাংশ ব্যাখ্যাদাতাগণের।’[8]

অবশ্য ঐ দশ রাত্রি বলতে এই দশ দিনকেই নির্দিষ্ট করে বুঝার ব্যাপারে কোনও ইঙ্গিত আল্লাহর রসূল (সা.)-এর নিকট হতে আসেনি; যা সুনিশ্চিতভাবে গ্রহণযোগ্য হবে। যার জন্যই এই ব্যাখ্যায় মতান্তর সৃষ্টি হয়েছে, আর আল্লাহই এ বিষয়ে অধিক জানেন।

২। নবী (সা.) সাক্ষ্য দিয়েছেন যে, এই দিনগুলি দুনিয়ার সর্বোকৃৎষ্ট দিন। যেমন পূর্বে উল্লেখিত হয়েছে।

৩। তিনি এই দিনগুলিতে সৎকর্ম করার জন্য সকলকে উদ্বুদ্ধ করেছেন। যেহেতু এই দিনগুলি সকলের জন্য পবিত্র ও মর্যাদাপূর্ণ এবং হাজীদের জন্য পবিত্রস্থানে (মক্কায়) আরো গুরুত্বপূর্ণ।

৪। তিনি এই দিনগুলিতে অধিকাধিক তাসবীহ, তাহমীদ, তাহলীল ও তাকবীর পড়তে আদেশ করেছেন।[9]

৫। এই দিনগুলির মধ্যে আরাফাহ ও কুরবানীর দিন রয়েছে।

৬। এগুলির মধ্যেই কুরবানী ও হাজ্জ করার মত বড় আমল রয়েছে।

হাফিয ইবনে হাজার (রহ.) বলেন, ‘একথা স্পষ্ট হয় যে, যুলহাজ্জের প্রথম দশ দিনের বিশেষ গুরুত্বের কারণ; যেহেতু ঐ দিনগুলিতে মৌলিক ইবাদতসমূহ একত্রিত হয়েছে যেমন, নামায, রোযা, সদাকাহ এবং হাজ্জ। যা অন্যান্য দিনগুলিতে এইভাবে জমা হয় না।[10]

[1] (ইবনে কাসীর ৪/৩৭১) [2] (বুখারী, আবূ দাঊদ) [3] (দারেমী ১/৩৫৭) [4] (আহমাদ, ইরওয়াউল গালীল ৩/৩৯৯) [5] (তাফসীর ইবনে কাসীর ৫/৪১২) [6] (বুখারী ১৬নং) [7] [8] (তাফসীর ইবনে কাসীর, ফাতহুল কাদীর ৫/৪৩২) [9] (সহীহ তারগীব ১২৪৮নং) [10] (ফাতহুল বারী ২/৪৬০)